Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

রবিবার ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » অনুসন্ধান 

নড়াইলে একজন শিক্ষক দিয়েই চলছে বিদ্যালয়

নড়াইলে একজন শিক্ষক দিয়েই চলছে বিদ্যালয়
উজ্জ্বল রায় নড়াইল ১৩ মার্চ ২০১৬, ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন Print

নড়াইল: জেলার একটি প্রান্তিক পর্যায়ের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের নাম ৪নং নড়াগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালে বেসরকারি রেজিস্ট্রি প্রাইমারি স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সম্প্রতি অন্যসব স্কুলের সাথে এটিও সরকারি স্কুলে পরিণত হয়।

গত প্রায় ১ বছর যাবত, স্কুলটি একাই চালিয়ে নিচ্ছেন এই স্কুলের সহকারী শিক্ষক, তমা সাহা। একবার এ ক্লাসে কিছুক্ষণ পড়ানোর পরে আবার অন্য ক্লাসে পড়াচ্ছেন তিনি। অন্যক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা তখন হয় মাঠে না হয় বাড়িতে গিয়ে ঘুরে আবার ক্লাসে এসে বসছে। এভাবে গত এক বছরে অন্তত ৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী স্কুল ছেড়ে চলে গেছে।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, স্কুলের একমাত্র শিক্ষক তমা সাহা এই স্কুলে যোগদান করেন ২০১২ সালের ২১ এপ্রিল তখন আরও ৩ জন শিক্ষক সহ মোট ৪ জনে সুনামের সাথেই চালাতেন এই স্কুলটি। এরপর ২০১৪ সালে নভেম্বরে অবসরে যান স্কুলের প্রধান শিক্ষক নওশের চৌধুরী। এ সময় প্রধান শিক্ষকের দ্বায়িত্ব পান সহকারি শিক্ষক আকমান হোসেন মোল্যা, কিন্তু ৭ দিন পরে তিনিও অবসরে যান। ২০১৫ সালের মার্চে অবসরে যান অপর শিক্ষক আবুল কালাম ফকির। সেই থেকে তমা একাই চালাচ্ছেন স্কুলের সকল কাজ।

স্কুলের বর্তমান ছাত্র-ছাত্রী প্রায় ১৭০ জন। এর মধ্যে শিশু শ্রেণিতে ২২ জনকে ভর্তি করা হলে ও শিক্ষকের অভাবে ক্লাস নেয়া হয়না। ৫ম শ্রেণিতে ছাত্র-ছাত্রী ২৮ জন, এদের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে ১ম ও ২য় শ্রের সাথে ৫ম শ্রেণির ক্লাস নেয়া শুরু হয় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে। দুপুর সাড়ে বারোটায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ছুটি হয়ে গেলে বাকি ৩য় এবং ৪র্থ শ্রেণির সাথে ৫ম শ্রেণির ক্লাস শুরু হয়ে চলে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। দুরাবস্থার মধ্যে দিয়ে ও আশেপাশের অনান্য স্কুলের তুলনায় ফলাফল ভালো বলে জানা যায়। ২০১৫ সালে পিএসসি পরীক্ষায় ৩২ জনের মধ্যে ৩১ জনই পাশ করেছে।

স্কুল চলাকালীন সময়ে দেখা গেল, স্কুলের সামনে ছেলেমেয়েরা লং জাম্প প্রাকটিস করছে, কেউ আবার গোল্লাছুট খেলছে। স্কুল চলাকালীন সময়ে খেলাধুলার ব্যাপারে প্রশ্ন করাতে- ৩য় শ্রেণির মিশকাত উত্তর দিলো, ‘এখন অন্যদের ক্লাস চলছে আমাদের ক্লাস আরও পরে হবে।’

৪র্থ শ্রেণির খাদিজা জানায়, ‘একজন শিক্ষক আমাদের পড়াতে পারছেন না, আমাদের স্কুলের লেখাপড়া খারাপ হচ্ছে বলে বেলাল, ইমন, নাছিমা, মুক্তা এরকম আমাদের অনেক বন্ধু স্কুল ছেড়ে চলে গেছে।’

৫ম শ্রেণির আজিজ খান বলেন, ‘আমাদের একজন মাত্র ম্যাডাম। উনি একবার আমাদের কিছু পড়ায়ে আবার অন্য ক্লাস চলে যান। অনেক সময় পড়া বুঝতে ও পারিন, তখন আবার ম্যাডামকেও পাই না।’

স্কুলের একমাত্র শিক্ষক তমা সাহা সকালে এসে নিজেই জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। তারপর ছাত্রদের নিয়ে ক্লাস করতে চলে আসেন। ৫ম শ্রেণির ছাত্রদের পড়া দিয়ে চলে আসেন প্রথম শ্রেণিতে। আবার তাদের কিছু পড়া নিয়ে ২য় শ্রেণিতে। এভাবে চলতে থাকে দিনভর।

তিনি জানান, সকালে আসি, আর বিকালে বাড়ি যাই। দুপুরে কোনও রকম বিস্কুট খেয়ে কাটাতে হয়। বাড়ি কাছে হলেও যাবার উপায় নেই। কষ্ট করে শিক্ষকের কাজটুকু করতে পারলে ও প্রধান শিক্ষকের দ্বায়িত্ব পালন করতে কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাসে রিপোর্ট পাঠাতে হয় অন্য স্কুলের শিক্ষকদের দিয়ে। নিজের কষ্ট নিয়ে ভাবছি না, ছেলেমেয়েদের ভালোভাবে লেখাপড়া করাতে পারছি না এটাই কষ্টের ব্যাপার। অনেক ছেলে-মেয়ে স্কুল ছেড়ে চলে যাচ্ছে, অনেকে লেখাপড়াই ছেড়ে দিচ্ছে। একজন মানুষ কিভাবে সব সামাল দেব?

নড়াগাতী থানা আওয়ামীলীগ নেতা জাহান চৌধুরী জানান, সদরের স্কুল গুলোতে শিক্ষকের অনেক ভীড় থাকলে ও আমাদের মতো এসব গ্রামের স্কুলে শিক্ষকের আসতে চায়না। গ্রামের শিক্ষকেরা সদরে যাবার জন্য টাকা দিয়ে তদবির করে, অথচ গ্রামের শিশুদের মানুষ করার দ্বায়িত্ব তারা নিতে চায় না। এতে শতভাগ ছেলে মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হবে না।

শিক্ষকের ঘাটতি প্রসঙ্গে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জেছের আলী জানান, নড়াগাতী সরকারি প্রাইমারি স্কুলে একসাথে ২ জন এবং পরবর্তীতে আরও একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ায় এধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে আমি আগেই মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কোন শিক্ষকই অন্য স্কুলে যেতে চান না। তবে মৌখিকভাবে একজন শিক্ষককে ওই স্কুলে পাঠদানের জন্য এক সপ্তাহ আগে পাঠানো হয়েছে।

ব্রেকিংনিউজ/ডিএইচ



আপনার মন্তব্য

অনুসন্ধান বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং