Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

সোমবার ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, পূর্বাহ্ন

প্রচ্ছদ » অনুসন্ধান 

প্রকাশক দীপন হত্যা

চলছে ‘কমন মেথড’ তদন্ত

চলছে ‘কমন মেথড’ তদন্ত
শাফি উদ্দিন আহমদ ০২ নভেম্বর ২০১৫, ৮:৩৭ অপরাহ্ন Print

ঢাকা: জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা এবং শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল ও তার দুই লেখক বন্ধুকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা চেষ্টাকারী দুর্বৃত্তদের এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। গতকাল সোমবার নিহত দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান জলি বাদি হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছেন। তবে এসব ঘটনা অনুসন্ধানে ‘কমন মেথড’ ব্যবহার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সিসি টিভি’র ফুটেজ আর জঙ্গিবাদ, এই দুটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে চালানো হচ্ছে তদন্ত কার্যক্রম।

ঘটনা ও ঘটনাস্থল আলাদা হলেও তা একই গোষ্ঠীর কাজ বলে ধারনা পুলিশের। প্রকাশক দীপন হত্যা এবং অপর প্রকাশক টুটুলসহ তিন লেখককে একই কায়দায় হত্যাচেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। দুটি ঘটনাও প্রায় একই সময়ে হয়েছে। এটি নিষিদ্ধ কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীরই কাজ বলে ধারনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এ জন্য তারা পৃথক দুটি ঘটনাস্থলের আশপাশের বাড়ি ও রাস্তা থেকে সংগৃহীত সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে খুনিদের শনাক্তের চেষ্টা করছে।

দেশে গত এক বছরে ৫ জন ব্লগার একইভাবে খুন হন। সেসব ঘটনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার উল্লাহ বাংলা টীমের (এবিটি) সংশ্লিষ্টতা পায় পুলিশ। যদিও অধিকাংশ ব্লগার হত্যারই রহস্য উন্মোচন করতে পারেনি পুলিশ। শুধু হত্যার ধরন দেখেই তারা ধারনা করছেন, অন্য ব্লগার হত্যাকারীরাই প্রকাশক দীপন হত্যা ও আরেক প্রকাশক টুটুলকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে।

দীপন হত্যা মামলা থানা পুলিশ তদন্ত করলেও ছায়া তদন্ত করছে ডিএমপির গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (ডিবি)।

ডিএমপির মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম বলেন, নিহত প্রকাশক দীপন হুমকি পেয়েছিলেন, এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে ছিল না। লালমাটিয়ার হামলার সঙ্গে ওই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র আছে কি-না তাও জানার চেষ্টা হচ্ছে। মনিরুল আরও বলেন, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) লোকেরাই বলেছে ব্লগার হত্যার সঙ্গে তাদের কর্মীরাই জড়িত। তবে অন্য কোনও জঙ্গি সংগঠন এর সঙ্গে জড়িত কিনা তা বিবেচনায় রেখে তদন্ত চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে ও গত ফেব্রুয়ারিতে একই কায়দায় নিহত লেখক ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক থাকার কারণেই কি টার্গেট হয়ে ছিলেন দীপন, সেটাও জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে ঘটনার পরদিন শনিবার রাতে আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা এবং এই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় আল কায়দার ভারতীয় উপমহাদেশ ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জামায়াত, আনসারুল্লাহ বাংলা, আনসার আল ইসলাম সবই একসূত্রে গাঁথা। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রই এসব হত্যাকাণ্ডের-. সঙ্গে জড়িত বলে ধারনা তার।
গত ৩১ অক্টোবর রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তিনতলায় জাগৃতির প্রকাশনীর অফিসে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে রাজধানীর লালমাটিয়ায় সি ব্লকের ৮/৩ নম্বর বাড়ির চারতলায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আহমেদুর রশীদ টুটুল ও তার বন্ধু কবি রণদীপম বসু এবং তারেক রহিমকে কুপিয়ে ও গুলি করে ভেতরে ফেলে দরজা বন্ধ করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। দুটি ঘটনায় পৃথক মামলা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে র‍্যাব-পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে।

 সোমবার দুটি ঘটনাস্থলই পরিদর্শন করেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তারা আশপাশের বাড়িতে লাগানো সিসি টিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেন। কথা বলেন প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে। তবে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কোন কথা বলেননি। লালমাটিয়ার ঘটনাস্থলের ওই বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দা এবং প্রতিবেশীদের মতে, বাড়িতে কোন দারোয়ান না থাকায় ঘটনাটি বুঝে উঠার আগেই পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন, ওই বাড়িটিতে কোচিং সেন্টার থাকায় কখন কে আসে যায় তা নির্ণয় করা যায় না। বাসার গেট সবসময় খোলা থাকে বলেও স্থানীয়রা।

শুদ্ধস্বর প্রকাশকসহ তিনজনই শঙ্কামুক্ত : সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কর্ণধার আহমেদুর রশীদ টুটুল ও তার বন্ধু কবি রণদীপম বসু এবং তারেক রহিমকে অনেকটাই শঙ্কামুক্ত।

সারা দেশে বিক্ষোভ-মানববন্ধন করেছে লেখক-প্রকাশকেরা : এক প্রকাশককে হত্যা ও আরেক প্রকাশককে হত্যাচেষ্টার প্রতিবাদে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতি ও বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক সমিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাসহ লেখক সাহিত্যিকদের বেশ কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। কর্মসূচি শেষে তারা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে সব জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সারা বাংলাদেশে দুপুর দুইটা পর্যন্ত বইয়ের দোকানগুলো বন্ধ ছিল।

লেখকদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া : চলতি বছরের শুরু থেকেই একের পর এক যেভাবে লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়ে তাঁদের খুন করা হচ্ছে তাতে ক্ষুব্ধ হচ্ছে সমাজের সকল স্তরের মানুষ। গত শনিবার জাগৃতি প্রকাশনের মালিক ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা, অন্যদিকে শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়। এ ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লেখক ও কবিদের অনেকে। প্রতিক্রিয়ায় ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ব্লগার হত্যাকাণ্ডের-ের পর এক প্রকাশককে হত্যা এবং অন্যদের ওপর আক্রমণে আমরা মর্মাহত হয়েছি। সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে এদের প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, দীপন ও টুটুল আমার প্রকাশক। একজন লেখক হিসেবে প্রকাশকদের যখন আক্রমণ ও নিহত করা হয়, তখন সেটা আমার শরীরেও লাগে। আমি মনে করি প্রকাশকদের বন্ধনটাই এমনই। আমি এই দুজন প্রিয় মানুষের ওপর আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ডের-ের বিচার দাবি করছি।

লেখক ও প্রাবন্ধিক স্বকৃত নোমান বলেন, শুদ্ধস্বর কার্যালয়ে আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ যাদের ওপর হামলা হলো এবং জাগৃতির প্রকাশক দীপন হত্যাকাণ্ডের- একইসূত্রে গাঁথা। এভাবে চলতে পারে না, চলতে দেয়া যায় না। একাত্তরে যেভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল, স্বাধীনতার এত বছর পর ঠিক একই কায়দায় এখন আবার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হচ্ছে। অথচ দেশে এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায়। আর কতজন লেখক-প্রকাশক নিহত হলে সরকারের বোধদয় হবে? এর প্রতিকারে লেখকদেরই রাস্তায় নামতে হবে।

বাপ্পাদিত্য বসুকে হত্যার হুমকি : নম্বরবিহীন এসএমএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রীর সাবেক সভাপতি ও গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক বাপ্পাদিত্য বসুকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। গত রোববার রাত ৯ টা ৯ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে তার মুঠোফোনে একটি নম্বরবিহীন এসএমএস আসে। ইংরেজিতে তাতে লেখা রয়েছে Be prepared... Next target you... । তবে এ ঘটনায় তিনি কোনো জিডি করেননি। বাপ্পাদিত্য বসু বলেন, লালবাগ ও শাহাবাগ থানায় আমার চারটি জিডি করা আছে। তাই নতুন করে আর জিডি করিনি। তবে মৌখিকভাবে পুলিশকে জানিয়ে রেখেছি। এর আগে সময় প্রকাশনীর কর্ণধার ফরিদ আহমেদকেও হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে।

ব্রেকিংনিউজ/এসইউএ



আপনার মন্তব্য

অনুসন্ধান বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং