Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » অনুসন্ধান 

জীবন পানির মরণ কাব্য

জীবন পানির মরণ কাব্য
শাফি উদ্দিন আহমদ ২০ অক্টোবর ২০১৫, ৭:২৪ অপরাহ্ন Print

ঢাকা: এইতো কিছুদিন আগেও খাবার পানি নিয়ে তেমন সচেতনতা ছিল না। তবে, ইদানিং সচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে রাজধানীসহ সারা দেশজুড়ে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই সুযোগে ফুটপাতের টং দোকান ও খাবার হোটেল থেকে শুরু করে চাইনিজ রেস্তোরাঁ, অফিস-আদালত ছাড়াও বাসাবাড়িতেও জার ও প্লাস্টিক কনটেইনারে সরবরাহকৃত মিনারেল ওয়াটারের জমজমাট ব্যবসা জেঁকে বসেছে। জার বা কনটেইনারে সরবরাহকৃত প্রতি গ্লাস পানির দাম মাত্র ১ টাকা হওয়ায় মানুষ সরল বিশ্বাসে তা পান করছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে এগুলোর কোনোটাই বিশুদ্ধ পানি নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দিনের পর দিন ভোক্তাদের সাথে ভয়ঙ্কর প্রতারণা করলেও খাদ্যপণ্যের একমাত্র মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই এ ব্যপারে প্রায় উদাসীন।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে বিএসটিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা ‌‌‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌জনবলের অভাবকে অজুহাত হিসেবে তুলে ধরেন ব্রেকিংনিউজের কাছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা জুড়ে রয়েছে ৪ শতাধিক ফিল্টার পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানেই ফিল্টার পানির নাম দিয়ে নোংরা পরিবেশে জার ভর্তি করছে ওয়াসার দূষিত পানিতে। কোনো কেনো স্থানে আবর্জনার ভাগারের উপরে দিয়ে পাইপ দিয়ে অবৈধ লাইন থেকে পানি সংগ্রহ করে ভরা হচ্ছে জারে। সেই নোংরা পানি ভর্তি জারের মুখ প্লাস্টিকের আবরণে আটকে দেয়া হচ্ছে। পরে অটো রিক্সা, ভ্যান ও পিকআপের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন দোকান, হোটেল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হচ্ছে সেই পানি। বিশেষ করে ফুটপাতের চায়ের দোকান, হোটেলসহ অন্যান্য ছোটখাটো দোকানে এর সরবরাহের পরিমাণ বেশি। সরবরাহকৃত এসব পানির জার প্রতি মূল্য নেয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা করে। পরিণামে, এই দূষিত পানি পান করে সাধারণ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে জন্ডিস, ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগ ও কিডনি ফেইলিউরের মতো মারাত্মক রোগে।

জানা গেছে, শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই দৈনিক এমন দূষিত পানির জার বিক্রি হচ্ছে ২৫ হাজারের বেশি। বিএসটিআই’র সিএম লাইসেন্সে পানি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের যেসব হাইজেনিক কন্ডিশন রয়েছে, তা বেশিরভাগ বৈধ পানি কারখানার মালিকরাও মানে না। অল্প পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় বেশকিছু ওয়ান লাইন ফিল্টারের হাউজহোল্ড ধরনের প্লান্ট গড়ে উঠেছে বিভিন্ন এলাকায়। এসব কারখানার অধিকাংশের অবকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। রাস্তার পাশে নোংরা এবং ঘিঞ্জি বসতিপূর্ণ এলাকায় তা গড়ে উঠছে। কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তির মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরি, ওজন টেকনোলজি অথবা আল্ট্রাভায়োলেটসহ অপরিহার্য যন্ত্রপাতির ব্যবহার নেই। এছাড়াও ওইসব কারখানায় নেই নিজস্ব কেমিস্ট। উৎপাদিত প্রতি ব্যাচ পানির ল্যাবরেটরি রিপোর্ট সংরক্ষণ করা তো দূরের কথা, তা তৈরিও করা হয় না। নকল মনোগ্রাম ও ব্যাচ নম্বর ছাপিয়ে লেভেল লাগিয়ে নির্বিঘ্নে মানহীন পানি বাজারজাত করা হচ্ছে।

সাধারন মানুষের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিএসটিআই মাঝে মাঝে নামকাওয়াস্তে অভিযান চালায়। কিছু জরিমানা আদায় করে সিল করে দেয়। কিন্তু অভিযানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না বলে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠে চক্রটি।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পানি উৎপাদন কারখানা ভাঙ্গা নোংরা ঘরে, সিঁড়ির নিচে, মুরগির আড়তের ভেতর, রেললাইনের পাশে খোলা ঘরে। নেই তাদের বিএসটিআই’র অনুমতিপত্র। কারখানায় জীবাণুনাশক ব্যবহার না করেই শুধু পানি দিয়ে ঝাঁকিয়ে দৃশ্যমান ময়লা পরিষ্কার করা হয় জারের।

জারগুলো যে প্রতিষ্ঠান, হোটেল রেস্টুরেন্টে সরবরাহ করা হয় খালি হওয়ার পর তা নোংরাভাবে ফেলে রাখা হয়। স্থানাভাবে এগুলো ব্যবহারের পর বাথরুম বা টয়লেটের ভেতরেও রাখতে দেখা গেছে। কারখানায় ফেরত আনার সময় এগুলোর মুখ বন্ধ থাকে না বলে পাখির মল, ধুলা, বালি, জীবাণু খুব সহজেই ভেতরে ঢুকে যেতে পারে। তাই জীবাণুনাশক দিয়ে জারগুলো পরিষ্কার করতে ওয়াশিং প্ল্যান্ট ব্যবহার করা জরুরী হলেও তা না করে হাতেই পরিষ্কার করা হয়। জারে পানি রিফিল করার সময় ফিলিং মেশিন ব্যবহার করতে হয়। ফিলিং মেশিনের সঙ্গে আল্ট্রাভায়োলেট- রে থাকে। ফিল্টারের মাধ্যমে পানির ময়লা ছাঁকা হলেও জীবাণু আটকায় না। এই রশ্মির মাধ্যমে জীবাণু ধ্বংস করা হয়। একটি প্রমাণ সাইজের রে বাল্বের মূল্য ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু কারখানায় অনেক সময় রে মেশিনের বাল্ব নষ্ট হলে পরিবর্তন করা হয় না। অনেক কারখানায় আবার আল্ট্রাভায়োলেট-রে মেশিনই নেই।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড.রাশেদ নূর বলেন, পানি উৎপাদন করে তা বাজাতজাত করার আগে একজন কেমিস্ট কর্তৃক পরীক্ষা করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ২/১টি কারখানা ছাড়া কোথাও কেমিস্ট নেই। পানি উৎপাদন কারখানায় ল্যাবরেটরি থাকাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু কিছু কারখানায় ল্যাব থাকলেও তার কোনো ব্যবহার নেই। এছাড়া অনেক কারখানায় পানি পরীক্ষার রিপোর্টও পাওয়া যায় না। ফলে এসব নিম্নমানের এবং জীবাণুবাহী পানি পানে নানান প্রাণঘাতী রোগ বাসা বাধতে পারে মানব দেহে।

সেফ ওয়াটার নামক একটি ফিল্টার পানির মালিক খালেদ বকস্ এই প্রতিবেদককে বলেন, ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করে এক জার পানি বাজারজাত করতে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু একটি জারের বাজার মূল্য ১৪ থেকে ২০ টাকা। তাই আমরা কারখানা থেকে ৫/৬ টাকায় পানি ভরে এনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ২৫/৩০ টাকায় সরবরাহ করি। পানি মার্কেটিং এবং জার পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে পানি উৎপাদন কারখানার মালিককে কিছু ভাবতে হয় না। মালিক শুধু কল খুলে রাখে।

ব্রেকিংনিউজ/এসজে



আপনার মন্তব্য

অনুসন্ধান বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং