Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » সাক্ষাৎকার 

গ্রেনেড ও রাইফেলের গুলির শব্দে আমার বিয়ের পটকা বেজেছিল

গ্রেনেড ও রাইফেলের গুলির শব্দে আমার বিয়ের পটকা বেজেছিল
বাবুল হৃদয় ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫, ৯:৩৩ পূর্বাহ্ন Print

ঢাকা: সময়টা তখন খুব ভালো ছিল না। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হল। দেশ থমথমে অবস্থা। এরই মধ্যে ১৯৭৫ সালে সেনা অভ্যুত্থানে দেশ উত্তাল। কারফিউ, চারদিকে গ্রেনেড হামলা, রাইফেলের গুলি। তারমধ্যে ৯ নভেম্বর আমার বিয়ে হয় রংপুরে। বর ইঞ্জিনিয়ার একেএম নুরুজ্জামান। বিয়েতে তেমন কোনো আয়োজন ছিল না। তবে আমার বিয়ের রাতে গ্রেনেড ও রাইফেলের গুলির শব্দে আমার বিয়ের পটকা বেজেছিল।

রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার নিজ বাসায় ব্রেকিংনিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে নিজের সর্ম্পকে এভাবেই বলছিলেন দেশ বরেণ্য কন্ঠশিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা। তিনি সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন একুশ পদকসহ নানা পুরস্কার। দীর্ঘ ৬০ বছরের সঙ্গীতে জীবনের প্রাপ্তী-অপ্রাপ্তী ও ক্ষোভের কথা ব্রেকিংনিউজকে জানিয়েছেন প্রখ্যাত এই শিল্পী।

ব্রেকিংনিউজ: আপনার শৈশব ও শিল্পী হওয়ার গল্প আমাদের জানাবেন?

ফাতেমা তুজ জোহরা: আমার শৈশবের সোনা ঝরা দিনগুলো কেটেছে জয়পুরহাটে। শিল্পী হওয়ার গল্পটা তখন থেকেই শুরু। বাবা সৈয়দ ফরিদ উদ্দিন পেশায় ছিলেন ডাক্তার। কিন্তু নেশায় পুরোপুরি রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়ক। তাই গানের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। বাবার হাত ধরেই সঙ্গীতে মনোনিবেশ করছি। বড় হয়ে বাবার মতো আমিও রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবো এমনটাই ভাবতেন সবাই। কিন্তু বাবা মোড়টা ঘুরিয়ে দিলেন।

একদিন বললেন, ‘তোমার কণ্ঠে নজরুলের গান করার ক্ষমতা রয়েছে। তাই তুমি নজরুলের গান গেয়ো।’ সেই শুরু। নজরুলের গানের নেশাটা তখনই ঝেঁকে বসল মাথায়। প্রথমে বাবার কাছে গান শেখা শুরু করি। এরপর গুরুর কাছে যাই। গুরু হাবিবুর রহমান (সাথী ভাই) আমাকে গান শেখাতেন।

ওই সময় জয়পুরহাটের অন্য ছেলে মেয়েরা যখন সন্ধ্যা হলেই পড়তে বসত তখন আমার সন্ধ্যা শুরু হতো হারমোনিয়ামে হাত রেখে। কখনো আমি গান গাইছি আর বাবা তবলা বাজাচ্ছেন, কখনো বা তবলা বাজানোর দায়িত্ব বর্তেছে মেয়ের কাঁধেই। এ ছিল বাড়ির প্রতিদিনের দৃশ্য।

সন্ধ্যার গানের সে আসর শেষ হতো ঘড়ির কাঁটা রাত ১টার ঘরে পৌঁছানোর পর। এমন কোনো সন্ধ্যা ছিল না, যে সন্ধ্যায় গান করা হয়নি। তখন হয়তো মা বসে বসে সেলাই করছেন, বই পড়ছেন কিংবা খরচের খাতা লিখছেন।

তবে শিল্পী জীবনের এই পর্যায়ে এসে উপলব্ধি করি- ‘আমার বাবা ছিলেন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা।’ তিনি যদি আমাকে স্বপ্ন না দেখাতেন, তাহলে হয়তো আজ ফাতেমা তুজ জোহরা হতে পারতাম না। শিল্পী হওয়ার পেছনে আমার স্বামীরও বিশাল অবদান রয়েছে।

ব্রেকিংনিউজ: বেতারে যোগ দিলেন কখন?
ফাতেমা তুজ জোহরা: ১৯৭৪ সালের দিকের কথা। বাংলাদেশ বেতার আর টেলিভিশনে তখন গান গাওয়া মানে বিরাট ব্যাপার। এই সময়ে বেতারে প্রথম গান গাই।



ব্রেকিংনিউজ: প্রেম বা বিয়ে সম্পর্কে কিছু বলেন..
ফাতেমা তুজ জোহরা: (এবার হাসতে হাসতে) যার সঙ্গে প্রেমছিল, তাকেই বিয়ে করেছি। (পাশেই বসা ছিলেন স্বামী ইঞ্জিনিয়ার একেএম নুরুজ্জামান, তাকে দেখিয়ে) ও অনেক হ্যান্ডসাম ছিল। চশমা পড়তো। চশমার কারণে আমার ওকে ভালো লাগতো।

পাশ থেকে নুরুজ্জামান হাসতে হাসতে বললেন, আমি এর আগে অনেক জানার চেষ্টা করেছি জানতে পারিনি। আজ প্রথম জানলাম।

ফাতেমা তুজ জোহরাকে ভালোবাসা প্রসঙ্গে নুরুজ্জামান যোগ করলেন, ওর চোখ দেখ! ..এরার দুজনেই হাসলেন।

ফাতেমা তুজ জোহরা: ... ও (নুরুজ্জামান) ছায়ানটের ছাত্র ছিল। বড় শিল্পী হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ায় সেটা আর সম্ভব হয়নি। আমার গান তিনি রাজশাহী বিশ্বব্যিালয়ের কোন অনুষ্ঠানে শোনেন। বলেছিলেন, ‘তোমার গান শুনলাম।  তোমার গান আমার ভালো লেগেছে।আমার ইচ্ছা তোমাকে বড় শিল্পী বানাবো। সে থেকে ভালোলাগা- ভালোবাসা। শেষ পর্যন্ত বিয়ে।’

আমার স্বামী আমার গানের জন্য সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। অসৎ অর্থ উপার্জন করে তিনি আমাকে বড় শিল্পী বানাতে চাননি।



ব্রেকিংনিউজ: বর্তমান ব্যস্ততা কি নিয়ে?
ফাতেমা তুজ জোহরা: গান ও পরিবার নিয়েই ব্যস্ততা। সকালে টিভি চ্যানেলে অনুষ্ঠান থাকে। আগের মতো এখনো ডাক আসে । নানা সামাজিক কাজে যোগ দিতে হয়। তবে শৈশবের স্বভাব এখনো রয়েছে। রাত অবধি গান গেয়ে বিছানায় যাওয়া এবং একটু সকাল করে ঘুম থেকে ওঠা আজও একই নিয়মে চলে।

ব্রেকিংনিউজ: লেখালেখি তো করতেন?
ফাতেমা তুজ জোহরা: হ্যা, এখনো লেখছি। লেখতে হলে পড়তে হয়। পড়া কিংবা লেখার জন্য তাই রাতটাই সাধারণত বেছে নেয়া হয়। আমার লেখা ‘সোনা মুখীর কদিন’ নামে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া ছড়া ও কবিতার বইও বাজারে রয়েছে।

ব্রেকিংনিউজ: অভিনয়েও তো আপনাকে দেখা গেছে..
ফাতেমা তুজ জোহরা: অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত বহু আগে থেকেই। আমার অভিনীত প্রথম টিভি নাটক ‘লাগুক দোলা’ বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। এরপর এ পর্যন্ত প্রায় ১১টি এক ঘণ্টার নাটকে অভিনয় করেছি। একটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছি। ছবিটির নাম ‘ভালোবাসার সাদাকালো’। ছবিটি এখনো মুক্তি পায়নি।

ব্রেকিংনিউজ: সঙ্গীত জীবনে প্রাপ্তির কথা বলেন?
ফাতেমা তুজ জোহরা: সঙ্গীত জীবনে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শ্রোতাদের ভালোবাসা। এছাড়া একুশে পদক, ভারতের সাংস্কৃতিক সংগঠন সন্ধানী থেকে গৌরী প্রসন্ন মজুমদার স্মৃতি সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছি।

ব্রেকিংনিউজ: অপ্রাপ্তি আছে কি?
ফাতেমা তুজ জোহরা: অপ্রাপ্তি নেই। আজ কোটি মানুষ ফাতেমা তুজ জোহারাকে চেনে। তার গান এখনো মনোযাগ দিয়ে শ্রোতারা শোনে। অপ্রাপ্তি নেই, তবে কিছু মন্দলাগা আছে।


ব্রেকিংনিউজ: এবার পরিবার সম্পর্কে একটু বলেন...
ফাতেমা তুজ জোহরা: স্বামী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার একেএম নুরুজ্জামান। সরকারি চাকরি ছিল। এখন একটি প্রাইভেট জব করে। বড় মেয়ে তমা চারুকলায় পড়াশোনা করেছে। এখন তিনি সঙ্গীত শিল্পী। তমার জামাই ব্যাংকার। দ্বিতীয় ছেলে নাঈম, ফ্যাশন ডিজাইনার। বর্তমানে কাজ করছে এটিএন নিউজে। নাঈমের স্ত্রী নূপুর, একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে। ছোট মেয়ে তৃতীয়া, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। তার জামাই তন্ময়, পেশায় সাংবাদিক।

ব্রেকিংনিউজ: আপনার সঙ্গীত নিয়ে আগামীর ভাবনা কি?
ফাতেমা তুজ জোহরা:  সৃষ্টিশীল কাজ করতে আমার ভালোলাগে। নতুন কিছু কাজ করার পরিকল্পনা করছি।

ব্রেকিংনিউজ/ বিএইচ/এইচএস/জেএম



আপনার মন্তব্য

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং