Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » সাক্ষাৎকার 

‘লেখক ছাড়া আর কিছুই হতে চাইনি’

‘লেখক ছাড়া আর কিছুই হতে চাইনি’
সাক্ষাৎকার ডেস্ক: ২৩ এপ্রিল ২০১৫, ৪:১৬ অপরাহ্ন Print

ঢাকা: রুবাইয়াৎ আহমেদ একজন সাংবাদিক, নাট্যকর্মী ও কথাসাহিত্যিক। তিনি নেত্রকোণা জেলায় ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নারী : শিল্প ও সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য লাভ করেছেন পিএইচ.ডি ডিগ্রি। সম্পৃক্ত রয়েছেন ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে। বর্তমানে ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এ জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

এ বছর তার ‘একজন সাব-এডিটরের কতিপয় ছেঁড়াখোঁড়া দিন’ পাণ্ডুলিপির জন্য জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার-২০১৫ লাভ করেছেন। তিনি লন্ডনের শেক্সপিয়রস গ্লোব থিয়েটারে প্রথম বারের মতো বাংলা ভাষায় মঞ্চায়িত নাটক ‘দ্য টেম্পেস্ট’র অনুবাদ ও রূপান্তর করেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১০। নির্বাচিত কবিতা (হ্যারল্ড পিন্টার ও ইসমাইল কাদারে); বর্ণনাত্মক নাটক : ‘বর্ণদূত’; অনুবাদ নাটক সংকলন : ‘পঞ্চস্বর’; গল্পগ্রন্থ : ‘আত্মহনন কিংবা স্বপ্নপোড়ানো আখ্যান’; ছোটদের গল্প : ‘আলসেকুঁড়ে’, সীমানা ছাড়িয়ে; গবেষণা : তারেক মাসুদ; বর্ণনাত্মক নাটক : জিয়ন্তকাল, হিড়িম্বা এবং রঙমহাল। পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ তরুণ লেখক হিসেবে কমাশ্রী পদক-২০১২। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।

ব্রেকিংনিউজ: শুরুতেই পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি জানতে চাইবো।
রুবাইয়াৎ আহমেদ: আমি আমার অনুভূতি একটু অন্যভাবে প্রকাশ করতে চাই, একটু ভনিতা করে। যেমন- এই জীবনে ট্রাফিকপুলিশ, পাইলট, মেজর, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, ক্রিকেটার, দাবারু– কতকিছুই না হতে চেয়েছি। কিন্তু পরিণত বয়সে লেখক ছাড়া আর কিছুই হতে চাইনি, চাইও না। আমি ভাগ্যবান, লেখক হতে চেয়ে আমার মা-বোন অর্থাৎ যাঁদের নিয়ে আমার একান্ত পরিবার তাদের বিরাগভাজন হইনি। কিন্তু বাকি অধিকাংশের কাছেই লেখা একটি অর্থসম্পর্করহিত ‘অকাজ’ কিংবা শখের ব্যাপার। এটি সবার কাছে অন্যান্য পেশার মতো কোনো পেশা নয়, হতে চাওয়ার মতো কোনোকিছু নয়। এই সমাজে শুধু লিখে জীবনধারণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি এখনো (দু’একজন ব্যতিক্রম রয়েছেন)। এ কারণে এটি কারো জীবনের লক্ষ্য হয় না, কারণ বৃহদার্থে এর কোনো অর্থকরী আবেদন নেই। কিন্তু একটি পুরস্কার, একটি স্বীকৃতি সবার কাছে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা বা হতে চাওয়ার মতো খানিক আবেদন সৃষ্টিতে সহায়তা করে। এই পুরস্কার অর্জনের আগেও আমি লেখক হওয়ার চেষ্টা করেছি, এরপরও করে যাবো। মাঝখান দিয়ে এটি এক ঝলক ভালোলাগার পরশ ছুঁইয়ে দিল। আজ যাঁরা এদেশের কথাসাহিত্যে অগ্রগণ্য, নিরন্তর বিস্ময় উপহার দিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের লেখার মাধ্যমে, তাঁদের অনেকেই ইতোপূর্বে এই পুরস্কারটি অর্জন করেছেন। ফলে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং যাচাইয়ের মানদণ্ড উন্নত। আমার একটি সৃষ্টিকে গ্রহণ করার জন্য, স্বীকৃতি দেয়ার জন্য আমি আনন্দিত এবং কৃতজ্ঞ জেমকন পরিবারের কাছে।

ব্রেকিংনিউজ: ‘একজন সাব-এডিটরের কতিপয় ছেঁড়াখোঁড়া দিন’ লেখার ভাবনা সম্পর্কে বলবেন কি?
রুবাইয়াৎ আহমেদ: আমি একজন সাব-এডিটর। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে এই পেশাতেই প্রথম প্রবেশ করি এবং আজ অবধি এতেই নিয়োজিত। আমি খুব কাছ থেকে এই পেশার মানুষদের দেখেছি। এটি একাধারে অনেক সৃজনশীল মানুষকে এই কঠিন শহরে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে, ঠিক তেমনি তাঁরা প্রায় সবাই কম-বেশি বৈষম্যের শিকারও হয়েছেন। তো, সাব-এডিটর হওয়ার কারণে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানা ধরনের বিচিত্র সংবাদ আমার জানা হতো। আমি লক্ষ্য করে দেখলাম, বিনষ্টির সংবাদের চাহিদা বেশি। সেই চাহিদা সংবাদমাধ্যমের কর্তাব্যক্তিদের মাঝে যেমন, পাঠকের মাঝেও সমানভাবেই ক্রিয়াশীল। এইসব সংবাদ একজন মানুষের মনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা নিয়ে হয়তো সতর্কতা রয়েছে, গবেষণা হয়েছে। কিন্তু যিনি এর মধ্যেই বসবাস করেন, এইসব বারোয়ারি সংবাদ নিয়ে রাতদিন কাটান তাঁর মানসিক অবস্থাটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে কেউ কি ভাবেন? তো, একজন সংবেদনশীল সাব-এডিটরের মনের ভেতরে এসব সংবাদ কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তারই একটি প্রস্তাবনা এই উপন্যাস। সেই সঙ্গে আধিপত্যবাদী, পুঁজিবাদী, একনায়কতান্ত্রিক, নিপীড়নমুখী রাষ্ট্র ও কর্পোরেট দুনিয়ায় মানুষের অসহায়ত্বও আমাকে পীড়া দেয় প্রতিনিয়ত। মানুষের মানবিক আচরণবিমুখিতাও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই মনে হলো বিষয়গুলোকে নিয়ে লেখা দরকার। এটি খানিকাংশে আত্মজৈবনিক আখ্যানও বটে। কিংবা হয়তো সংবেদনশীল যেকোনো সাব-এডিটর এমন কি যেকোনো মানুষের গল্পই হয়তো এটি। তবে তা সরাসরি নয়, অন্তর্গত সত্যের নিরিখে নিঃসন্দেহে। সাব-এডিটরকে কেন্দ্রীয় চরিত্ররূপে কোনো উপন্যাসের খোঁজ আমার জানা নেই। নিজের পেশার প্রতি কৃতজ্ঞতা, এই পেশার মানুষদের প্রতি সম্মানের একটি স্মারকও এই উপন্যাস।

ব্রেকিংনিউজ: আপনার লেখালেখির অনুপ্রেরণা কে?
রুবাইয়াৎ আহমেদ: যদি ছোট্ট বেলার কথা বলি তবে অবশ্যই আমার বড়বোন ইভানা ইলিয়াসের কথা বলতে হবে। শৈশবে না বুঝে লেখার দিনে সে-ই ছিল আমার অনুপ্রেরণা। ও এখন অনেক ভালো গল্প লিখে। সামান্য একটি বিষয় ওর লেখার গুণে পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে। আমি ওমন করে পারি না। ওর এই সামর্থ্য আমার থাকলে খুব ভালো হতো। তো, স্কুল পেরিয়ে যখন কলেজে পড়ি তখন কবি হতে চেয়েছি। যারাই লেখালেখি করে তারা সম্ভবত প্রত্যেকেই প্রথমজীবনে কবিই হতে চান। এই যে আমি গদ্য লিখি বা যাই লিখি আমার গন্তব্য কিন্তু কবিতা কিংবা বলা যেতে পারে টোটাল আর্ট বা শিল্পে। শিল্পে আমি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী। ফলে আমার লেখা গদ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে পদ্য অথবা সামগ্রিক কোনো শিল্পে উত্তীর্ণ হোক এটাই আমার চাওয়া। মহাবিশ্ব-প্রকৃতি-মানুষ-জীব এসবকিছু থেকেই তো খুঁজে পাই আমার উপকরণ। এসবকিছুই আমার প্রেরণা। আর যদি বলেন, কোন কোন শিল্পী বা লেখক আমার প্রেরণা তবে বলতে পারি, পূর্বজ সব লেখকের উত্তরাধিকার আমি। তাঁরা সবাই আমাকে কোনো না কোনোভাবে চালিত করেন। বিশেষ নামতো অবশ্যই বলতে চাই- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সেলিম আল দীন।

ব্রেকিংনিউজ: কেন আপনি লেখক হলেন?
রুবাইয়াৎ আহমেদ: আসলে ছোটবেলায় অন্য অনেকের মতোই আমি বিভিন্ন কিছু হতে চেয়েছি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে এক পর্যায়ে মনে হল, লেখক হওয়া ছাড়া এই জীবনে আমার আসলে আর কোনো লক্ষ্য নেই। সেই চেষ্টাই করছি এখন। কারণ, আমি কিছু প্রকাশ করতে চাই, কিছু সৃষ্টি করতে চাই। তো, লেখালেখি ছাড়া অন্যকিছু তো পারি না। লেখাও যে পারি এমন নয়। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার মনে হল, এই মাধ্যমেই আমি নিজেকে প্রকাশ করতে পারবো, আমার সৃষ্টিশীল ইচ্ছে পূরণ করতে পারবো। এ জন্যেই বোধ হয় লেখক হতে চাই।

ব্রেকিংনিউজ: একজন তরুণ লেখক হিসেবে তরুণদের কি পরামর্শ দেবেন?
রুবাইয়াৎ আহমেদ: কোনো পরামর্শ নেই। শুধু বলতে চাই- আত্মমাঝে বিশ্বকায়া, জাগাও তাকে ভালোবেসে।

ব্রেকিংনিউজ: সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যের কোন ধরনের লেখা আপনার ভালো লাগে?
রুবাইয়াৎ আহমেদ: কবিতা, উপন্যাস, গল্প তো ভালো লাগেই। তবে বিশেষ করে নাটক বা আখ্যানের প্রতি পক্ষপাত একটু বেশি।

ব্রেকিংনিউজ: প্রবীণদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি?
রুবাইয়াৎ আহমেদ: প্রবীণরা আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন, দিশা দেবেন। তাঁর প্রেরণা যোগাবেন পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে। তবে এদেশে এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখি, গোষ্ঠীবদ্ধতা কিংবা আত্মীয় অথবা কাছের মানুষের প্রতি অতিমাত্রায় পক্ষপাত। এতে করে প্রকৃত সামর্থ্যবান শিল্পীর প্রতি অবিচার করা হয়। শিল্পীর সামর্থ্যের পাশাপাশি তাকে সমান সুযোগও দিতে হয়, তা নাহলে তার বিকাশ রহিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, হতাশায় বিভ্রান্ত অথবা বিপথগামী হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তো, প্রবীণরা এইক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুজদের সমৃদ্ধ করতে পারেন, তরুণদের ভেতরে প্রেরণারূপে বিরাজ করতে পারেন।

ব্রেকিংনিউজ: লেখালেখি সম্পর্কে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানাবেন কি?
রুবাইয়াৎ আহমেদ: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তো এখন বলতে পারবো না। কয়েকটি বিস্তৃত পরিসরে লেখার পরিকল্পনা করছি, এগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজের ভেতর বহন করে চলেছি। এখন শব্দে-বাক্যে সেগুলো প্রকাশ করতে চাই। সেই চেষ্টাই করছি।

ব্রেকিংনিউজ: আপনার পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
রুবাইয়াৎ আহমেদ: আমার তো সেই অর্থে অগণিত পাঠক নেই। খুবই সীমিত। কিন্তু তাঁরা আমার জীবনে আশীর্বাদ। তাঁদের উৎসাহ আমাকে প্রতিনিয়ত নতুন কাজে, নতুন লেখায়-সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করে। আমি আমার পাঠককে স্বার্থপরের মতো দুইরূপে দেখতে চাই। ভালো হলে তাঁরা যেমন প্রশংসা করবেন, ঠিক তেমনি ভালো না হলে তাঁরা যেন অকৃপণভাবে আমার দোষত্রুটি ধরিয়ে দেন। তবেই তাঁরা হবেন আমার সত্যিকারের পাঠক-শুভাকাঙ্ক্ষী।

ব্রেকিংনিউজ: ব্রেকিংনিউজের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন!
রুবাইয়াৎ আহমেদ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। ব্রেকিংনিউজের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

ব্রেকিংনিউজ/এসইউএম



আপনার মন্তব্য

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং