Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

বৃহস্পতিবার ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » মুক্তমত 

ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের নেপথ্যে রহস্যময়ী নারী

ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের নেপথ্যে রহস্যময়ী নারী
সিরাজুল ইসলাম ০৯ মার্চ ২০১৬, ৮:০০ অপরাহ্ন Print

কুয়েত দখলের পর ইরাকে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এপ্রিল ক্যাথেরিন গ্ল্যাস্পিকে একেবারেই লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যায় মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু কেন? কুয়েত দখলের মাত্র ৮দিন আগে এই কূটনীতিক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেই বৈঠকে সাদ্দামের সঙ্গে তার কী কথা হয়েছিল? অথবা কে ছিলেন এই গ্ল্যাস্পি? এসব নিয়ে এবারের এই আলোচনা। তবে এখানে বলে রাখি- সাদ্দাম সরকারের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ শুরুর রাতে কী ঘটেছিল আশা করি সে আলোচনা আনব পরবর্তী লেখায়। এবার চলে যাই আজকের মূল আলোচনায়।

ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ে মার্কিন সমরবিদ ও চালবাজরা দীর্ঘদিন ধরে যে পরিকল্পনা করছিলেন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ করে দেন সাদ্দাম। আবার যারা সাদ্দামকে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক অপকর্মে বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে আট বছরের মুসলিম ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে সব ধরনের সমর্থন যুগিয়েছিলেন তারা তার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। সাদ্দামকে মদদ দেয়ার দলে কুয়েত ছিল অন্যতম প্রধান শক্তি।

ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার অল্প পরেই সেই কুয়েত দখল করে বসেন সাদ্দাম। আবার সাদ্দামকে নানা সহায়তা দিয়ে বড় করেছিল যে মার্কিন প্রশাসন সেই মার্কিন সরকার সাদ্দামের মৃত্যুর মহাসড়ক তৈরি করে। আর মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক চিত্র পাল্টে দিতে সরেজমিনে থেকে যে ব্যক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি হলেন ইরাকে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এপ্রিল ক্যাথেরিন গ্ল্যাস্পি। তিনি আমেরিকার পক্ষ থেকে সরাসরি সাদ্দামকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছিলেন কুয়েত দখলের জন্য।

১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং বাগদাদে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্যাথেরিন গ্ল্যাস্পির মধ্যে ‘ভাগ্য নির্ধারণকারী’ বৈঠক হওয়ার পর ২৫ বছর পেরিয়ে গেছে। ওই বৈঠকে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে সাদ্দামকে কুয়েত দখলের গ্রিন সিগন্যাল দেন গ্ল্যাস্পি। বৈঠকের ৮দিন পর সাদ্দাম কুয়েতে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিলেন।

’৯০-এর আগস্ট মাসেই গ্ল্যাস্পির ওপর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বসে। সে নিষেধাজ্ঞা ছিল গণমাধ্যমের কাছে মুখ না খোলার ব্যাপারে। অর্থাৎ এপ্রিল ক্যাথেরিন গ্ল্যাস্পি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না। ভয়টা ছিল এই যে, সাদ্দামের সঙ্গে বৈঠকে যে কথা হয়েছে তা যদি আবার ফাঁস হয়ে যায়! এ নিয়ে ২০০৫ সালে পাকিস্তানি সাংবাদিক কালিম ওমর জং পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। ওই প্রবন্ধে কালিম ওমর বলেন, “২০০২ সালে গ্ল্যাস্পি ফরেন সার্ভিস থেকে অবসর নেয়া সত্ত্বেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তাকে গণমাধ্যম থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করেছে।”

সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর আর কখনো গ্ল্যাস্পি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি। কখনো টিভি টকশোতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হননি। বাগদাদে শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সম্পর্কে কিংবা নিজের সম্পর্কে তিনি কখনো কোনো প্রবন্ধ লেখেননি; কোনো বইও লেখেননি। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? তিনি কী লুকিয়ে চলেছেন?

ক্যাথেরিন গ্ল্যাস্পি ১৯৪২ সালের ২৬ এপ্রিল কানাডার ভাংকুভারে জন্মগ্রহণ করেন। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের অকল্যান্ড মিলস কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে তিনি গ্রাজুয়েট হন এবং পরে ১৯৬৫ সালে হন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি মার্কিন কূটনীতিক সার্ভিসে যোগ দেন এবং সেখান থেকেই তিনি মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।

কুয়েত, সিরিয়া ও মিশরে দায়িত্ব পালন করার পর তাকে ১৯৮৯ সালে বাগদাদে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। স্মরণ করা যেতে পারে, গ্ল্যাস্পিকে এমন একটা সময় ইরাকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া যখন মাত্র ইরাক-ইরান যুদ্ধ শেষ হয়েছে। তার আগের ৮ বছর ইরাক প্রতিবেশী ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত ছিল আর সেই যুদ্ধে আমেরিকা জোরালোভাবে ইরাককে সমর্থন দিয়েছিল।

কুয়েতে ইরাকি আগ্রাসনের বিষয়ে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে ইতিহাসের আরো কিছু বিষয় জেনে নেয়া যেতে পারে। ১৯১৮ সালে কুয়েত ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের বসরা প্রদেশের একটি অংশ। কিন্তু ইরাক ছোট্ট এ দেশটির স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৬১ সালে।

ইরাক-ইরান ৮ বছরের যুদ্ধের সময় কুয়েত ইরাককে ১৪শ কোটি ডলার সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছিল। যুদ্ধ অবসানের পর ইরাক ও কুয়েতের মধ্যে সঠিক সীমানা নির্ধারণ, পানিসীমায় প্রবেশ ও কুয়েতের তেল বিক্রির সেই সময়কার মূল্য নির্ধারণ ও সীমান্ত এলাকায় তেলকূপ খনন নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

১৯৯০ সালের ২৫ জুলাই সাদ্দামের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পি এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। গ্ল্যাস্পি নিজেই বৈঠক অনুষ্ঠানের অনুরোধ করে বলেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশের (সিনিয়র বুশ) পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের জন্য তার কাছে জরুরি বার্তা রয়েছে। বাগদাদে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় গ্ল্যাস্পি এই প্রথম সাদ্দামের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠক করেন। অবশ্য এটা ছিল তার শেষ বৈঠকও বটে। ওই বৈঠকের অংশ বিশেষ এমন ছিল-

মার্কিন রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পি: “ইরাকের সঙ্গে সর্ম্পকোন্নয়নের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট বুশ থেকে আমি সরাসরি নির্দেশনা পেয়েছি। বেশি দামে তেল বিক্রির বিষয়ে আপনার আকাঙ্ক্ষার প্রতি আমাদের বিশেষ সহানভূতি রয়েছে, যা নিয়ে আপনার সঙ্গে কুয়েতের প্রাথমিক দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। (একটু থেমে) আপনি জানেন আমি এখানে দুই বছর ধরে আছি এবং (ইরাক-ইরান যুদ্ধের পর) আপনার দেশ-গঠনের বিষয়ে অসাধারণ প্রচেষ্টার প্রশংসা করছি। আমরা জানি আপনার অর্থের প্রয়োজন। (একটু থেমে) আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আপনি দেশের দক্ষিণে বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছেন। সাধারণত এসব বিষয় নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না, কিন্তু ভিন্ন প্রেক্ষাপটে কুয়েতের বিরুদ্ধে যখন আপনার অন্য হুমকি থাকছে তখন আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। এ কারণে বন্ধুত্বের অনুভূতি থেকে আপনাকে জানানোর জন্য আমি একটি নির্দেশনা পেয়েছি। যা আপনার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আপনার সেনারা কেন কুয়েত সীমান্তের এত কাছে জড়ো হয়েছে?”

প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন: “যেমনটি আপনারা জানেন, কয়েক বছর ধরে কুয়েতের সঙ্গে আমাদের দ্বন্দ্ব নিরসনের বিষয়ে একটা মীমাংসায় পৌঁছানোর জন্য আমি সব ধরনের চেষ্টা করেছি। আাগমী দুই দিনের মধ্যে একটি বৈঠক হবে; আমি ছোট্ট একটি সুযোগ দেয়ার জন্য এই সংলাপে বসতে প্রস্তুত হয়েছি। (একটু থেমে) যখন আমরা কুয়েতিদের সঙ্গে বৈঠকে বসছি এবং দেখছি যে, একটা আশা আছে, তখন কিছুই ঘটবে না। কিন্তু যদি আমরা কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে না পারি তাহলে তখন এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার হবে যে, ইরাকিরা মৃত্যুকে বরণ করবে না।”

মার্কিন রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পি: “কী ধরনের সমাধান গ্রহণযোগ্য হবে?”

প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন: “যদি পুরো সাত-ইল-আরব যা ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময়কার কৌশলগত লক্ষ্য তা যদি পেয়ে যায়, তাহলে আমরা কুয়েতকে ছাড় দেব। কিন্তু যদি আমরা সাত-ইল-আরবের অর্ধেক এবং পুরো ইরাক -এ দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হই, তাহলে তখন আমরা পুরো সাত-ইল-আরব ত্যাগ করব এবং কুয়েতকে দখলে নিয়ে ইরাকের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেব। যেমনটি আমরা প্রত্যাশা করে আসছি। (একটু থেমে) এ বিষয়ে আমেরিকার মতামত কী?”

মার্কিন রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পি: “আপনাদের আরব-আরব দ্বন্দ্ব, যেমন কুয়েতের সঙ্গে ইরাকের দ্বন্দ্বে আমাদের কোনো মতামত নেই। কুয়েত ইস্যু আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয় বলে ১৯৬০ সালে যে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছিল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার আমাকে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য জোরালো দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।”

এ কথা শুনে সাদ্দাম হেসে ওঠেন।

পরদিন ওয়াশিংটনে সংবাদ সম্মেলনে (১৯৯০ সালের ২৬ জুলাই) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মার্গারেট টুটওয়েইলারকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেন: “কুয়েত সীমান্তে ৩০ হাজার সেনা মোতায়েনের বিষয়ে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে কী কোনো কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে আমেরিকা? এ বিষয়ে মার্কিন সরকার কী কোনো রকমের প্রতিবাদ করেছে?”

সাংবাদিকদের এসব প্রশ্নের জবাবে মার্গারেট বলেছিলেন, “এ ধরনের কোনো প্রতিবাদের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই।”

কুয়েতে আগ্রাসন চালানোর দুই দিন আগে ‘নিকট প্রাচ্য’ বিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেলি কংগ্রেসকে বলেছিলেন- “কুয়েতকে রক্ষার জন্য আমেরিকার কোনো দায়বদ্ধতা নেই এবং ইরাক যদি কুয়েত আক্রমণ করে তাহলে কুয়েতকে রক্ষার কোনো উদ্দেশ্য আমেরিকার নেই।”

গ্ল্যাস্পি অত্যন্ত চাতুরতার সঙ্গে যে ফাঁদ পেতেছিলেন তা আরো জোরদার হলো মার্গারেট ও কেলির সমর্থনমূলক বক্তব্যে। এবং সাদ্দাম হোসেন ঠিক এমনটি বিশ্বাস করেছিলেন যে, তার সেনারা যদি কুয়েত দখল করে নেয়, তাহলে আমেরিকা কিছু্ই বলবে না। ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট অর্থাৎ গ্ল্যাস্পির সঙ্গে ইরাকি প্রেসিডেন্টের বৈঠকের মাত্র ৮ দিনের মাথায় সাদ্দামের জড়ো করা সেনারা কুয়েতে আগ্রাসন চালায়।

এর এক মাস পর ব্রিটিশ সাংবাদিকরা ২৫ জুলাই সাদ্দাম ও গ্ল্যাস্পির মধ্যকার বৈঠকের কথোপকথনের টেপ হাতে পান। বিস্ময়কর এ তথ্য হাতে পাওয়ার পর তা যাচাই করার জন্য মিসেস গ্ল্যাস্পির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন; তিনি তখন বাগদাদের মার্কিন দূতাবাস ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

প্রথম সাংবাদিক: (টেপ দেখিয়ে) ম্যাডাম অ্যাম্বাসাডর, এই বক্তব্য কী সঠিক?
রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পি জবাব দিলেন না।

দ্বিতীয় সাংবাদিক: “আপনি জানতেন সাদ্দাম কুয়েত দখল করতে যাচ্ছেন; কিন্তু আপনি তাকে তা না করার জন্য হুঁশিয়ারি দেননি। আপনি তাকে উল্টোটা বলেছেন যে, আমেরিকা কুয়েতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়।”

প্রথম সাংবাদিক: “আপনি এই আগ্রাসনে তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। এ বিষয়ে আপনি কী ভেবেছিলেন?”

মার্কিন রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পি: “অবশ্যই, আমি ভাবিনি এবং কেউ ভাবেনি যে, ইরাকি সেনারা পুরো কুয়েত দখল করে নিতে যাচ্ছে।”

প্রথম সাংবাদিক: “আপনি মনে করেছিলেন তিনি কুয়েতের কিছু অংশ দখল করবেন? কিন্তু আপনি তা ভাবলেন কী করে? সাদ্দাম আপনাকে বলেছিলেন যে, যদি সংলাপ ব্যর্থ হয় তাহলে তিনি সাত-ইল আরব ছেড়ে দিয়ে প্রত্যাশা মতো ইরাককে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেবেন। আপনি জানেন যে, ইরাকিরা সবসময় ঐতিহাসিকভাবে কুয়েতকে নিজেদের দেশের অংশ মনে করে।”
(রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পি কিছুই না বলে দুই সাংবাদিককে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন)

“আমেরিকা এ আগ্রাসনের বিষয়ে সবুজ সংকেত দিয়েছে। আপনি এতটুকুও স্বীকার করবেন না যে, সাদ্দামকে সবুজ সংকেত দেয়ার কিছু অংশ সঠিক ছিল, বিশেষ করে আল-রুমালিয়া তেল ক্ষেত্র দখল করার বিরোধিতা করত না আমেরিকা। কুয়েতের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা পারস্য উপসাগরীয় দ্বীপ (বুবিয়ানসসহ) এলাকার বিষয়ে ইরাকের দাবি সঠিক ছিল?”
(আবারো রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পি কোনো কথা বললেন না; তার লিমুজিন গাড়ির পেছনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল এবং গাড়িটি সাংবাদিকদের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল)

এর দুই বছর পর আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনবিসি’র নির্বাচনী বিতর্কের তৃতীয় রাউন্ডে অন্যতম প্রার্থী রস পেরোট বলেছিলেন, “আমরা তাকে (সাদ্দামকে) বলেছিলাম তিনি কুয়েতের উত্তরাংশ নিতে পারেন। এবং যখন তিনি পুরোটা নিয়ে নিলেন তখন আমরা তাকে টাইট দিতে গেলাম। এবং আমরা যদি তাকে না বলে থাকি তাহলে মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটি এবং সিনেটের ইন্টেলিজেন্স কমিটিকে কেন রাষ্ট্রদূত গ্ল্যাস্পিকে পাঠানো লিখিত দিকনির্দেশনা দেখতে বললাম?”

এই পর্যায়ে রস পেরোটের বক্তব্যে বাধা দিয়ে সে সময়কার প্রেসিডেন্ট এবং অন্যতম প্রার্থী জর্জ বুশ সিনিয়র চীৎকার করে বলেছিলেন, “আমি এর জবাব দেব। জাতীয় সম্মানের জন্য তা ঘটেছে।…..এটা সম্পূর্ণরূপে পাগলামি।”

পাগলামি হোক আর নাই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে ১৯৯০ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিকে রাষ্ট্রদূত এপ্রিল ক্যাথেরিন গ্ল্যাস্পি বাগদাদ থেকে ওয়াশিংটনে ফিরে যান। তারপর থেকে তাকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ৮ মাস ধরে অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে রাখে। এ সময়ের ভেতরে তাকে কোনো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয়নি।

শুধু তাই নয়, ১৯৯১ সালের ১১ এপ্রিল উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে প্রকাশ্যে আসতে দেয়া হয়নি। এরপর মার্কিন সিনেটের ফরেন রিলেশন্স কমিটির অনানুষ্ঠানিক শুনানিতে অংশ নিতে তিনি সর্বপ্রথম জনসমক্ষে আসেন। প্রেসিডেন্ট সাদ্দামের সঙ্গে তার বৈঠকের বিষয়ে সিনেট কমিটিতে তার শুনানি হয়।

সেই শুনানিতে তিনি বলেছিলেন, তিনি ইচ্ছাকৃত বড় রকমের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সাদ্দামের সঙ্গে বৈঠকের বক্তব্যকে তিনি বানোয়াট বলে মন্তব্য করেন, যা তার অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, ওই বক্তব্যের বড় অংশই ছিল সঠিক।

ঝানু এ কুটনীতিক পরবর্তী অ্যাসাইনমেন্টের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এরপর তিনি নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে লো-প্রোফাইল চাকরি নেন। পরে তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন শহরে মার্কিন কনসাল জেনারেল হিসেবে বদলি করা হয়। ২০০২ সালে তিনি কূটনৈতিক পেশা থেকে অবসর নেন এবং সেই থেকে আজ পর্যন্ত আর কখনো তার মুখে কিছু শোনা যায়নি। এটা অনেকটা এমন ব্যাপার যেন তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিই নন।

কুয়েত দখল এবং ইরাকে মার্কিন প্রথম হামলার পর প্রায় আড়াই যুগ চলে গেছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ে আমেরিকার কূটকৌশল বন্ধ হয়নি। পাশাপাশি হুঁশ হয়নি এ অঞ্চলের দেশগুলো বিশেষ করে রাজতান্ত্রিক আরব সরকারগুলোর। এখনো তারা আমেরিকাকেই সুরক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল বলে মনে করে।

(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, তেহরান প্রবাসী )

ব্রেকিংনিউজ/এইচএস



আপনার মন্তব্য

মুক্তমত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং