Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » মুক্তমত 

মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংবাদিক বাবাকে পুত্রের খোলা চিঠি

মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংবাদিক বাবাকে পুত্রের খোলা চিঠি
আহসান উদ-দৌলা মারুফ ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৬, ১১:০৬ পূর্বাহ্ন Print

যদি আবারো জন্ম নিতে হয় আমি তোমার সন্তান হয়েই জন্ম নিতে চাই। তোমার পথেই চলতে চাই যে পথ তোমাকে দেখে শিখেছি। তোমার মৃত্যুর আড়াই বছরের মাথায় আমি তোমার পেশাতেই পা রাখি। তুমি বেঁচে থাকলে হয়তো তোমার হাত ধরে সেটা হতো না। কারণ তুমি চাওনি আমি সাংবাদিক হই। মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগেও হাসপাতালের বেডে শুয়ে তুমি মাকে বলেছিলে- লতা তোমার ছেলেকে মানা করো এই পেশায় না আসতে ... অনেক কষ্ট হবে ওর ... ও পারবে না। আমি তোমার নিষেধ শুনিনি। অবাধ্য ছেলের মতো তোমারই প্রাণপ্রিয় দৈনিক ইত্তেফাক দিয়েই যাত্রা শুরু করলাম।

দীর্ঘ নয় মাসের অধিকাংশ দিন সেই সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ক্লাশ (মাস্টার্স) শেষ করে সন্ধ্যায় ইত্তেফাকে যেতাম। ফিরতাম অনেক রাতে। এতোগুলো মাস বিনাবেতনে কাজ করেও নানা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত চাকরিটা আমার হয়নি। মাস্টার্সও আর শেষ করা হয়নি। তবে দমে যাইনি। ইত্তেফাকে যেদিন প্রথম কাজ করলাম সেদিনই বিএসএস’র সার্ভিস থেকে নেয়া আমার লেখা মাত্র ছ’সাত লাইনের একটি নিউজ প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হলো।আত্মবিশ্বাসটা বেড়ে গেলো প্রচণ্ড, লেগে থাকলাম। একে একে কেটে গেলো ৩০টা বছর।

দীর্ঘ এই সময়ে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দলমতের বাইরে থেকে কাজ করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছি অনেকবার। কিন্তু পড়ে যাইনি কখনো। কি করে আমি আপস করবো সাংবাদিকতায় যার আদর্শ ‘তুমি’। জীবন চলার পথে আমাদের এমনিতেইতো অনেক কিছুর সাথেই আপস করতে হয়, অনেক কিছু মানিয়েও নিতে হয়। কিন্তু পেশার সাথে আপস আর ঠকবাজি করলে মানুষের জীবনে আর কিইবা অবশিষ্ট থাকে? আমার কাছে এটা নিজের অস্তিত্ব আর স্বকীয়তাকে বিকিয়ে দেয়ার মতো। আমি অন্তত এটা বিশ্বাস করি আর বুকের একেবারে গহীন ভেতরে লালন করি।

তবে তোমার একটা না চাওয়া কিন্তু আমি রেখেছিলাম। অবশ্য সেটা ঠিক তোমার না চাওয়া ছিলো না। ছিলো তোমার অপারগতা। সুন্দর ছবি আঁকতাম একটা সময়। এইচএসসি পরীক্ষা ভালো হয়নি। কি করবো কোথায় পড়বো এসব ভেবে যখন কিছুটা হতাশ তখন তোমাকে বলেছিলাম আর্ট কলেজে ভর্তি হবো। তুমি রাজিও হলে। ফরমও নিয়ে এলাম। আমি কিন্তু চ্যান্স পেতামই। আর প্রস্তুতি সেতো আমার সব সময়ই ছিলো। কারণ আমিতো তখন যে কারো ছবি দেখেই অবিকল স্কেচ করতে পারতাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি আর ফরম জমা দেইনি। ওই যে তুমি মাত্র ক’দিন আগেই মাকে বলছিলে- আর্ট কলেজে পড়লেতো অনেক খরচ, তাই। আমি কিন্তু বাবা সেদিন কোন অভিমান করিনি তোমার ওপর। সবকিছু বুঝতাম বলেই আমি আর এগুইনি।

সাংবাদিকতায় আসা নিয়ে তোমার নিষেধের কারণগুলো মিথ্যে ছিলো না কখনোই। এখনো তা মিথ্যে নয়। তোমাকে দেখেইতো আমি জেনেছি কতোটা ঠিক কথা সেদিন তুমি বলেছিলে। জীবনের এতোটা পথ পেরিয়ে এসে আমিও দেখলাম কতোটা যন্ত্রণা আর দুঃখ-কষ্ট আছে এই পেশায়। তবে সেটা যদি সত্যি সত্যিই পেশা হয়ে থাকে আর ভেতরে সত্যিকারের পেশাদারিত্ব থাকে। যারা গলায় সাংবাদিকের সাইনবোর্ড লাগিয়ে ধান্দা করে চলেন তাদের এসব নিয়ে ভাবতে হয় না। সত্যি বলতে কি তোমরা যে সময়টা পার করেছো কিছুটা কষ্ট হলেও সামান্য মনের জোর থাকলেই সবদিক থেকে সৎ থেকে পেশায় টিকে থাকতে পারতে। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই।

সময় বদলেছে অনেক। চাইলেই সবাই সৎ থেকে পেশার প্রতি একনিষ্ঠ থাকতে পারে না। চারপাশে শুধুই লোভ-লালসা আর প্রলোভনের হাতছানি। প্রচণ্ড শক্ত কলিজা না থাকলে এর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা খুব কষ্টকর। কারণ এ পথে হাঁটাটা অনেক কঠিন। সবাই সে পথে হাঁটতে পারে না, জানেও না। তাদের কাছে সাংবাদিকতা কিসের মহৎ পেশা? রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি থেকে শুরু করে অসৎ উপার্জন। সহকর্মীদের ঠকিয়ে মালিক পক্ষের কাছে ভালো থাকা, বিপুল অর্থ আর সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলায় ব্যস্ত নামডাক আছে এমন অনেক সাংবাদিক। কিসের নীতি আদর্শ? সময় থাকতে থাকতে আর সুযোগ বুঝে নিজের আখের গুছিয়ে নেয়াটাই আজ তাদের কাছে সবচেয়ে বড়। যদিও এরাই আবার টেলিভিশনের পর্দায় অনেক নীতিকথা আর আদর্শের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন।

গুরু হিসেবে না পেলেও সেই ছেলেবেলা থেকেই আমি তোমাকে দেখেছি। মাকে দেখেছি দু’জনে মিলে কিভাবে বিশাল বড় এক সংসার চালাতে। কতো কতো অভাব-অনটন। অথচ তারপরও কি এক সুখের সুবাতাস বইতো যার স্পর্শ পাওয়ার আনন্দটা সবার ভাগ্যে জোটে না। সত্যিই পরিবার-পরিজন ছাড়াও একেবারেই কেউ না। কেবলই চেনাজানা- এমন মানুষের জন্যও যে অনেক কিছু করা যায়, করতে হয়। সেটা যে কেবল তোমাকে আর মাকে দেখেই শিখেছি।

খেতে নয়, আমি তোমাকে অসংখ্য মানুষকে চাকরি দিতে দেখেছি। অন্যায় ও মিথ্যের পক্ষে নয়, আমি তোমাকে সব সময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে দেখেছি। কোন ভয়-ভীতির কাছে তুমি মাথা নত করোনি। কোন লোভ-লালসা কোনদিনও স্পর্শ করতে পারেনি তোমাকে।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তুমি যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেলে তখন আমি রীতিমতো যুবক। তাই কোন কিছুই আমার অজানা বা অদেখা নয়। আমি দেখেছি কি করে খোদ এই রাজধানির বনানিতে কয়েক বিঘা জমি, গুলশানে বিরাট আলিশান বাড়ি, টাকা বোঝাই ব্রিফকেস- আরও কতো কতো স্বর্ণালংকার কি অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছো তুমি। অথচ বাসায় সে সময় হয়তো রান্নার চাল নেই। তোমার পাঞ্জাবির পকেটেও টাকা নেই। খুব অবাক হতাম। কোন কিছুই ভুলিনি আমি। সবটাই মনে আছে। কেবল চোখে দেখিনি, আমার পুরো অস্তিত্বের একেবারে ভেতরে আজো গাঁথা হয়ে আছে সব স্মৃতি।

তোমার মৃত্যুর আগে আমি হাসপাতালের করিডোরে অনেক রাতে যেমন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন হিরু মিয়াকে তোমার জন্য ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখেছি, তোমার মৃত্যুর পর আবার উল্টোটাও দেখেছি। মাকে দেখেছি হিরু মিয়া ও তার ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মিয়ার সামনে চোখের জল ফেলতে। আসলেতো এমনটাই হওয়ার কথা ছিলো! এমনটাইতো হয়, হয়ে আসছে।

পৃথিবীতে সবাই সবকিছু পারে না জানি। কিন্তু তোমার মতো কি আর কেউ হবে না? সবাই কি তাহলে আজ পথ হারিয়ে ফেলেছে? মানুষের সবশেষ আশ্রয়স্থলটাও কি আজ তবে অরক্ষিত? তবে আমি কিন্তু হারিনি বাবা। পাইনি কিছুই। তবুও দিয়ে গেছি যতোটুকু আমার সাধ্য।

আমার হাতে কোন প্রতিষ্ঠানের কোন ক্ষতি হয়নি কোনদিন। আমার কলমের খোঁচায় একজন সহকর্মীর চাকরিও যায়নি। আর পেশার সাথে আপস? সেটাতো আমার অবিধানেই নেই। আমার হাতে গড়া কোন কিছুই আমি ধ্বংস হতে দেইনি। যখন আর ঠেকাতে পারিনি তখন সরে এসেছি। পরে চেয়ে দেখেছি- তিল তিল করে গড়ে তোলা জিনিস কতো সহজে কি করে ধ্বংস হয়ে যায়।

(লেখক: সাবেক হেড অব নিউজ- আরটিভি, দিগন্ত টিভি, এসএটিভি ও মোহনা টিভি। তার বাবা আসফ উদ-দৌলা রেজা দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন।  লেখাটি তার ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া)

ব্রেকিংনিউজ/এইচএস



আপনার মন্তব্য

মুক্তমত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং