Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » মুক্তমত 

সাম্প্রদায়িকতা সাম্রাজ্যবাদ ও রাজনীতি

সাম্প্রদায়িকতা সাম্রাজ্যবাদ ও রাজনীতি
যতীন সরকার ২২ নভেম্বর ২০১৫, ৮:৫৮ অপরাহ্ন Print

ঢাকা: বিগত শতকের ষাটের দশকে আমাদের দেশটি যেন ‘ঝড়ের খেয়া’য় চড়ে বসেছিল। সেই খেয়া চলছিল ‘ঝড়ের মাতন বিজয়-কেতন নেড়ে/অট্টহাস্যে আকাশ খানা ফেড়ে’। আর খেয়ার যাত্রীদের ভেতরকার অগ্রসর চিন্তার মানুষগুলো চাইছিল ‘ভোলানাথের ঝোলাঝুলি ঝেড়ে’ সব ভুলের সলিল-সমাধি ঘটাতে।

জঙ্গি নায়ক আইয়ুব খান তখন হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুই পৃথক ভূখণ্ড নিয়ে গড়া ‘পাকিস্তান’ নামক কিম্ভূত রাষ্ট্রটির সিংহাসনে আসীন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রায় গোড়া থেকেই সে রাষ্ট্রের পূর্ব অংশটির অধিবাসীদের উপলব্ধিতে আসছিল যে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকের কোনো অধিকারই তারা ভোগ করে না, সাম্রাজ্যবাদের ছত্রচ্ছায়ায় বাস করেও পাকিস্তান রাষ্ট্রটি তার পূর্ব অংশে উপনিবেশের মতোই শাসন ও শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে। সে উপলব্ধিই এখানকার মানুষদের আপন অধিকার সচেতন করে তোলে। তাদের সেই সচেতনতারই প্রকাশ ঘটে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে, এবং সে লড়াইয়েরই অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। সেসব লড়াই-আন্দোলনেরই আধেয়রূপে বিশেষ অবদান রাখে সে সময়কার ‘সমকাল’সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকা। সেসব পত্রপত্রিকাকে আশ্রয় করেই সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সংহতির সঞ্চার ঘটে এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনই জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল রাজনীতিকে সংহত করে তোলে। সেই সংহত রাজনীতিই একসময় সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়, পাকিস্তানের কবলমুক্ত হয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।

ষাটের দশকের ‘সমকাল’-এর ভূমিকার কথা ঘুরেফিরেই স্মরণ করতে হয়। এ সময় এই সাহিত্যপত্রটিতেই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম নায়ক আবুল ফজলের অসাধারণ উৎকর্ষমণ্ডিত এমন কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যেগুলো তরুণসমাজের চিত্তকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে দিয়েছিল। অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী অত্যন্ত সঠিকভাবেই মন্তব্য করেছিলেন যে ‘এক সবল সুন্দর কাণ্ডজ্ঞানের’ সঙ্গে ‘একটি সৎ সাহস যুক্ত হয়ে’ আবুল ফজলকে দিয়ে ‘ষাটের দশকে এমন কিছু প্রবন্ধ লিখিয়ে নিয়েছিল, যে ক্ষেত্রে তিনি প্রায় একক কণ্ঠ ছিলেন। প্রবন্ধকার আবুল ফজল সেই সংকটের দিনে দেশের বিবেকের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়েছিলেন।’

নির্ভীক এই চিন্তাবিদ ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর এই ধর্মবিশ্বাসে সম্প্রদায়-ধর্মের ঊর্ধ্বে ছিল মানবধর্মের অবস্থান। ১৩৭১ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ‘সমকাল’-এ প্রকাশিত ‘মানবতন্ত্র’ প্রবন্ধে আবুল ফজল লিখেছিলেন-‘ধর্ম যদি মনুষ্যত্বের পরিপূরক বা নামান্তর না হয়, তাহলে ধর্মে আর মনুষ্যত্বে পদে পদে সংঘর্ষ অনিবার্য।’ এ রকম সংঘর্ষ থেকে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়েই মানবতাবাদী ধর্মবিশ্বাসী আবুল ফজল কলম চালিয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকের শেষেই ‘সমকাল’-এর মাঘ ১৩৬৫ (১৯৫৮) সংখ্যায় আবুল ফজলের ‘সাহিত্যের সংকট’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হলে পত্রিকার এই সংখ্যাটিকে পাকিস্তান সরকার বাজেয়াপ্ত করে। এর পরও শাসকচক্রের রক্তচক্ষু ‘সমকাল’কে তার পথচলা থেকে যেমন নিবৃত্ত করতে পারেনি, তেমনই সংযত করতে পারেনি আবুল ফজলের কলমকেও।

এ সময়েই অসম সাহসী অথচ একান্ত কৌশলী আরেকজন প্রাবন্ধিক ‘সমকাল’-এর পাতায় প্রকাশ করেছিলেন এমন কয়েকটি রচনা, যেগুলো পাকিস্তান রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব তথা বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেছিল। এই লেখকের আসল নাম আবদুল হক। কিন্তু ‘সমকাল’-এ প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো তিনি লিখেছিলেন আবু আহসান নামে। তিনি ছিলেন পাকিস্তানেরই একজন সরকারি কর্মচারী। অর্থাৎ বাঘের ঘরেই ছিল ঘোগের বাসা।

১৯৬৩ সালে প্রকাশিত ‘বাঙালী মুসলমান : ভূমিকা ও নিয়তি’ এবং ১৯৬৬ সালে ‘মুসলিম জাতীয়তা : পুনর্নিরীক্ষা’ আবদুল হকের এই দুটি প্রবন্ধেই যে রাষ্ট্রবিরোধিতার বীজমন্ত্র উচ্চারিত হয়েছিল-এমন কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বিশেষ করে দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে পাকিস্তানবিরোধিতার ব্যাপারে তেমন কোনো রাখঢাকই ছিল না। সাম্প্রদায়িকতাকেই যে জাতীয়তা বলে চালিয়ে দেওয়ার ধূর্ত প্রয়াস পাকিস্তান সৃষ্টির ভেতর মূর্ত হয়ে উঠেছিল-মুসলিম জাতীয়তার পুনর্নিরীক্ষার মাধ্যমে আবদুল হক সে সত্যেরই উন্মোচন ঘটিয়েছিলেন। সত্যের এ রকম উন্মোচন সে সময়কার অনেক তরুণকেই ধর্মতন্ত্রী সাম্প্রদায়িকতার বদলে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিল। তখনই পাকিস্তান ভেঙে বেরিয়ে আসার কথা না ভাবলেও এ অঞ্চলের অনেক মানুষই বাঙালিত্বের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে উঠেছিল এবং সে চেতনা থেকেই এখানে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূচনা ঘটেছিল।

বাঙালিত্ব তথা জাতীয় স্বাধিকার চেতনার পাশাপাশিই দল মেলতে থাকে শ্রেণিচেতনায়ও। এই ষাটের দশকেই রাজশাহী থেকে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তফা নূর-উল ইসলামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল অত্যন্ত উন্নতমানের একটি সাহিত্যপত্র ‘পূর্বমেঘ’। এই পূর্বমেঘের পাতাতেই প্রবন্ধকাররূপে আত্মপ্রকাশ করেন বদরুদ্দীন উমর।

১৯৬২ সালের শুরুতেই প্রচণ্ড ছাত্র আন্দোলন সারা দেশকে কাঁপিয়ে তোলে। সেই আন্দোলন থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যই পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল চক্র সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার পথ ধরে। শুরু হয়ে যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-অর্থাৎ নির্বিচারে হিন্দু নিধন। এই নিধন কর্মটি সবচেয়ে বেশি ঘটে রাজশাহী অঞ্চলে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ‘পূর্বমেঘ’-এ বদরুদ্দীন উমরের অনেকগুলো সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রবন্ধের প্রকাশ ঘটে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এর আগে যাঁরা লেখালেখি করতেন, তাঁদের প্রায় সবারই ছিল উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। উমরই প্রথম মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ সন্ধান করেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭-এই সময়সীমায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধগুলোরই সংকলন-‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘সংস্কৃতির সংকট’।

এই লেখাগুলো সে সময়ে যে রকম প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, প্রবন্ধজাতীয় কোনো লেখারই সে রকম জনপ্রিয়তা এর আগে বা পরে কখনো দেখা যায়নি। যারা কেবল হালকাচালের গল্প-উপন্যাস পড়তেই অভ্যস্ত, এ রকম লোককেও এই লেখাগুলোর একান্ত অনুরাগী পাঠক হয়ে উঠতে দেখেছি। ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’-উমর কথিত এই শব্দবন্ধ সেদিন জীবন্ত প্রবাদে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। উমরের লেখা অনেকের চোখ থেকেই দ্বিজাতিতত্ত্বের পর্দা অপসৃত করে ফেলেছিল, চিত্তলোকে প্রকৃত স্বাদেশিকতা ও স্বজাতীয়তার বোধ সঞ্চারিত করে দিয়েছিল।

তবে উমরের সেদিনকার লেখাগুলো যে সর্বজননন্দিত হয়েছিল, তা অবশ্যই নয়। অনেকের গায়ে এগুলো যেন বিছুটি লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই বিছুটির জ্বালায় অনেকেই এমন চিড়বিড়ানি শুরু করে দেয় যে তারা দিগি¦দিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তানবাদ যাদের মস্তিষ্ককোষে অনড় পাথর হয়ে চেপে বসেছিল, তখনকার এ রকমই একজন বুদ্ধিজীবী সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ‘পূর্বমেঘ’-এ উমরের সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বক্তব্যের একান্ত অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিলেন। উমর সেই প্রতিক্রিয়ার প্রত্যুত্তরও দিয়েছিলেন অত্যন্ত কড়া ভাষায় ও অকাট্য যুক্তিপ্রয়োগে।

শুধু সাজ্জাদ হোসায়েন নন, সাম্প্রদায়িক চিন্তার ধারক তথা দ্বিজাতিতত্ত্ব বিশ্বাসীদের অনেকেই নানাভাবে বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে থাকেন। এ রকম প্রতিবাদকারীদের সংখ্যাও মোটেই কম ছিল না। শুধু সংখ্যা নয়, প্রতাপও ছিল তাদের প্রচণ্ড। বিশেষ করে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের জঙ্গি শাসক আইয়ুব খান যখন ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে বেতারসহ সব গণমাধ্যমে ‘কাফেরবিরোধী’ গণহিস্টিরিয়া সৃষ্টি করে তুলেছিল, তখন তো অনেক শুভবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাদীপ্ত মানুষকেও বুদ্ধিহারা ও সাম্প্রদায়িক অপচৈতন্যে আচ্ছন্ন হয়ে উঠতে দেখেছি।

এ দেশের হিন্দুরা তো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গোড়া থেকেই দেশদ্রোহী তথা ভারতের দালাল বলে চিহ্নিত ছিল। যুদ্ধের সময় সেই ‘দালাল’দের অনেককেই ভারতের নাগরিক আখ্যা দিয়ে বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হলো। অন্য অনেককেই (হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত যেসব উকিল, ডাক্তার, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের সমাজে পরিচিতি ও প্রতিপত্তি ছিল) করা হলো কারাবন্দি। বন্দিশিবির বা কারাগারের বাইরে রইল যারা, তাদেরও জীবন হয়ে উঠল দুর্বিষহ। হিন্দুদের সম্পত্তি বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো, ‘শত্রু সম্পতি আইন’ জারি করে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হলো। আগে থেকেই ‘নিজ বাসভূমে পরবাসী’ হিন্দুদের অবস্থা দাঁড়াল ছিন্নমূল তরুর মতো।

পঁয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধ চলে মাত্র ১২ দিন-সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ থেকে ১৭ তারিখ। তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিনের উদ্যোগেই এই যুদ্ধবিরতি ঘটে এবং তাঁরই মধ্যস্থতায় ছেষট্টির জানুয়ারিতে তাসখন্দে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর এক বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

যুদ্ধ সমাপ্তির প্রায় অব্যবহিত পরই দেশের মানুষের বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মনোলোকে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থার সঞ্চার ঘটে। হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুটি সম্পূর্ণ পৃথক অংশ নিয়ে গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের পূর্ব অংশটি যে যুদ্ধকালে ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত-অগ্রসর চেতনাদীপ্ত বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ভাবনায় এ বিষয়টিই একান্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘সমকাল’-এর পাতায় সেই ভাবনারই নিরাবরণ প্রকাশ ঘটল আবদুল হকের ‘যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতা’ শীর্ষক প্রবন্ধটিতে। বুদ্ধিজীবী নন, এমন সাধারণ মানুষের চেতনায়ও সমস্যাটির ছায়াপাত ঘটল। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ঘোষিত ‘ছয় দফা’ দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ছেষট্টির ছয় দফা থেকে ঊনসত্তরের এগারো দফায় উত্তরণের মধ্য দিয়ে একাত্তরের স্বাধীনতার এক দফা নিয়ে রচিত আমাদের গৌরবময় ইতিহাস।

কিন্তু কেবলই কি গৌরবময়? অগৌরবের গ্লানিও কি ষাটের দশকেই সমাজকে কলঙ্কিত করে তোলেনি? অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুবাতাসের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতার ঝড়ো হাওয়ায় সেদিনকার খেয়া নৌকাটি কি টালমাটাল হয়ে ওঠেনি?

মনের ভেতর এ রকম সব প্রশ্নের উদয় হওয়া নিশ্চয়ই অহেতুক নয়। যদিও ষাটের দশকেই আবুল ফজলের মতো ধীমান লেখক বুদ্ধির মুক্তির প্রবাহটিকে সচল করে তুলেছিলেন, আবদুল হকের মতো বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাদীপ্ত প্রবন্ধকার পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেছিলেন, বদরুদ্দীন উমর মার্ক্সীয় শ্রেণিচেতনার আলোকে পাকিস্তানের অপদর্শন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রান্তি উন্মোচন করে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ভাবাদর্শের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। তবু আমরা তো এ-ও দেখেছি যে সে সময়ই প্রগতিভাবনার বিপরীতে প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িকতা প্রবল ও প্রচণ্ড হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রানুরাগী সুবুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি প্রতাপান্বিত অবস্থান ছিল রবীন্দ্রবিরোধী দুর্বুদ্ধিজীবীদেরও। নজরুলের খণ্ডায়নের বিরুদ্ধে যাঁরা দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের চেয়ে কম শক্তিধর ছিলেন না নজরুলকে ‘মুসলমান কবি’ বা ‘মুসলমানের কবি’ বানাতে চেয়েছিলেন যাঁরা। অর্থাৎ ভাবাদর্শ ও সাংস্কৃতিক চেতনায় ষাটের দশকের প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার ভেতরকার সংগ্রামের পরিচয় দিতে গিয়ে বলতেই হয়-‘কেহ কারে নাহি জিনে সমানে সমান’।

তবে আনন্দের সংবাদটি এই : রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়াশীলদের পরাজয় ঘটেছিল, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে তারা ঠেকাতে পারেনি, চার মূলনীতির সংযোগে সংবিধান রচনার মধ্যেও প্রগতির জয়ই ঘোষিত হয়েছিল। কিন্তু এরই বিপরীতে বেদনাদায়ক সত্যটি হলো : স্বাধীন বাংলাদেশে প্রগতির সেই জয় অব্যাহত রইল না, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সব ক্ষেত্রই প্রতিক্রিয়ার কালো থাবার অধিকারভুক্ত হয়ে গেল, পরাজিত শত্রুরাই বিজয়ের হাসি হাসতে লাগল। অনেক অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী শক্তিটি যখন রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার পেল, তখনো বেদনাদায়ক সত্যটি মিথ্যা হয়ে গেল না, বেদনার বদলে আনন্দের পুনরুদ্ধার ঘটল না। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলো বাংলাদেশের সংবিধানটিকে কাটাছেঁড়া করে মুক্তিযুদ্ধের মূল মর্ম ধর্মনিরপেক্ষতাকে লোপাট করে দিল, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম বানাল। সেই রাষ্ট্রধর্ম বজায় রেখেই সংবিধানে যখন ধর্মনিরপেক্ষতাও বহাল রাখা হলো, তখন তাকে গোঁজামিল ছাড়া আর কী বলা যায়?

এই গোঁজামিলের হাত থেকে পরিত্রাণের পথ আমাদের খুঁজে নিতেই হবে। সেই খুঁজে নেওয়ার তাগিদেই বিগত শতকের ষাটের দশক নিয়ে অনেক বাগ্বিস্তার করতে হলো আমাকে। অনেকের কাছে এটিকে ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ বলেও মনে হতে পারে। অথচ তা যে নয়, সে কথা প্রমাণ করার জন্যই পরে আরো কিছু কথা বলতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ

ব্রেকিংনিউজ/এমআর



আপনার মন্তব্য

মুক্তমত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং