Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » মুক্তমত 

কবে বাড়ি যাবো বাবা!

কবে বাড়ি যাবো বাবা!
প্রতিবেদক ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ৪:২০ অপরাহ্ন Print

ঢাকা: বাড়ি ফেরা মানে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা। যে অপেক্ষায় হয়তো বাবা-মা থেকে শুরু করে পাড়ার চাচি, ছেলেবেলার বন্ধু, দোকানের কাকা এমনকি ঘরের পাশের লেবুগাছটাও সামিল হয়। আর এই ক্ষণস্থায়ী আনন্দ ফুরিয়ে যেতে সময় লাগে না একটুও। কিন্তু যানবাহন সংকটের কারণে বাড়ি ফিরতে না পারলে ঈদের সবটুকু আনন্দ যেন এক মুহূর্তেই চরম বিষাদে পরিণত হয়।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বেশ কয়েকদিন ধরেই বিক্রি হচ্ছে রেলের অগ্রীম টিকিট। কমলাপুর স্টেশনের ২০টি কাউন্টার থেকে দেয়া হচ্ছে ঈদ যাত্রার টিকিট। আর এই টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে স্টেশনে টিকিটিপ্রত্যাশীদের উপচে পড়া ভিড় সহজেই চোখে পড়ে।

ভ্যাপসা গরম, ঠেলা-ঠেলি সহ নানা ভোগান্তি মাড়িয়ে টিকিটের প্রত্যাশায় আজ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন শত শত মানুষ। গত শুক্রবার ভোর রাত থেকেই শুরু হয় টিকিট সংগ্রহের জন্য লাইনে দাঁড়ানোর প্রতিযোগিতা। আর যেহেতু লম্বা সময় লাইনে থাকতে হয়েছে তাই সময় কাটানোর বন্দোবস্ত করে এনেছিলেন কেউ কেউ। দেখা গেল- কেউ কেউ সময় কাটিয়েছেন তাস খেলে, আড্ডা দিয়ে কিংবা পত্রিকা পড়ে। কাউকে আবার মোবাইল ফোন থেকে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে অপেক্ষার সময় কাটাতে দেখা গেছে।

বাবা-মায়ের সাথে ঢাকায় থাকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ফারজানা। দেশের বাড়ি নোয়াখালী। ঈদে সবার মতো সেও বাড়ি ফিরতে চায়। আর তাই কমলাপুর রেল স্টেশনে বাবার সাথে টিকিট সংগ্রহের আনন্দে সামিল হতে এসেছে সে। হয়তো গত কয়েকদিন ধরেই বাড়ি ফেরার একটা চাঞ্চল্যকর উত্তেজনা কাজ করছিলো তার মধ্যে। হাজারো টিকিট প্রত্যাশীদের ভীড়ে তার চোখ দুটো যেন বলাকার ডানার মতো উড়ছিলো ছোট একটি টিকিটের দিকে। কিন্তু তারা বাবা ফজলুল হক ঠিকই বুঝতে পারছেন ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ এতো সহজ কাজ নয়। এমনও হতে পারে টিকিট নাও পাওয়া যেতে পারে।

ফারজানার মামা তার জন্য নতুন জামা কিনে তাদের গ্রামের বাড়িতে রেখে গেছে। খবরটি পাওয়ার পর থেকে ফারজানার যেন আর বিলম্ব সহ্য হচ্ছিল না। নতুন জামার সেই মন মাতানো ঘ্রাণ। ঈদের দিন সকালে গোসল করে নতুন জামা পড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজেকে প্রদর্শন করা। হয়তো এরকম একটি মুহূর্ত ফারজানাকে বাড়ি ফেরার পথে তাড়িত করছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি সে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা তা বাবার কিছুটা ধারণায় থাকলেও ফারজানা একেবারেই অবুঝ।

সেই অবুঝ মনের সবুজ মেয়েটি গত রবিবার সকালে কমলাপুরে বাবার সাথে বসেছিলো। গরীবের সংসারে জন্ম নেয়ায় বাবা-মায়ের সাধ্য নেই প্রাইভেট কোনো গাড়িতে চড়িয়ে মেয়েকে নিয়ে ঈদ করতে বাড়ি যাওয়ার।

বাবা ফজলুল হক জানালেন- ‘গত ৮ বছর যাবৎ ঢাকায় স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে সংসার চালাই। প্রতিবার ঈদের সময় পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি ফেরার একটা প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু যোগোযোগ ব্যবস্থার দূরবস্থার কারণে গত রমজানের ঈদে ছুটি পেয়েও বাড়ি যেতে পারিনি। আজ নিয়ে চারদিন স্টেশনে আসলাম। কিন্তু এখনো টিকিট হাতে পেলাম না। পরশু থেকেই ফারজানা ঠিক মতো খাওয়া-দাওয়া করছে না। কান্নাকাটি করছে। কেবল বলছে- কবে বাড়ি যাবো বাবা। ঈদের আর মাত্র দু-তিন দিন বাকি। এখনো টিকিট পাইনি। জানিনা পাবো কিনা। না পেলে কোরবানির ঈদেও হয়তো ঢাকাতেই থাকতে হবে।’

এদিকে ঈদ এলেই বিভিন্ন সংবাদ শিরোনামে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং রেলমন্ত্রী উভয়ই ঈদে ঘরমুখো মানুষের বাড়ি ফেরা নিয়ে নানা ধরনের আশ্বাসের কথা শোনালেও সরেজমিনের দৃশ্য অনেকটাই ভিন্ন। কমলাপুর স্টেশনে সকাল থেকে ফারজানার মতো শিশুদের বসে থাকাই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

তবে কি এমপি-মন্ত্রীদের সব আশ্বাস মিথ্যা! সবটুকু হয়তো মিথ্যা নয়। কিন্তু তার চাইতেও গভীর সত্য হচ্ছে ফারজানার অপেক্ষারত চোখ। সে চোখে কেবলই বাড়ি ফেরার দৃশ্য। কিন্তু ফারজানার বাবার মতো আমরাও তার প্রশ্নের জবাবে নির্বাক। আমরা এখনও জানিনা- শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা ফারজানা।

ব্রেকিংনিউজ/এমআর



আপনার মন্তব্য

মুক্তমত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং