Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

শুক্রবার ২৩ আগস্ট ২০১৯, ৮ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, অপরাহ্ন

প্রচ্ছদ » মুক্তমত 

ছোট প্রশ্ন বিরাট উত্তর

ছোট প্রশ্ন বিরাট উত্তর
অধ্যাপক বিজন বিহারী শর্মা ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ৩:৪৮ অপরাহ্ন Print

ঢাকা: সাধারণত ছোট প্রশ্নের উত্তর ছোট হলেও অনেক সময় এর উত্তর অনেক বড় হতে পারে। যেমন কিছুদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ধরনের একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন যে, ছোট শিশুদের ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিতে হবে কেন? তারা যদি সব শিখেই আসবে তাহলে স্কুলে তাদের কি শেখানো হবে? তারা ভর্তি হতে আসার পরপরই তাদের ভর্তি করে নেয়া উচিত। এখানে ছোট প্রশ্নটি ছিল, 'ছোট শিশুদের ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিতে হবে কেন?' এর উত্তর কিন্তু বিশাল। এই ছোট প্রশ্নটি ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা হয়নি, এবং উত্তরও খোঁজা হয়নি। আর এই কারণেই এই সমস্যার সমাধানও হয়নি।

ঢাকা শহরে শিশুশিক্ষার জন্য উন্নতমানের স্কুলের সংখ্যা খুব কম। অথচ এ ধরনের স্কুলে যারা পড়তে চায় তাদের সংখ্যাও কম নয়। ফলে এসব স্কুলে যে আসন থাকে আবেদনকারী প্রার্থীর সংখ্যা থাকে তার কয়েকগুন। এ অবস্থায় সীমিত সংখ্যক আসনে ভর্তির জন্য এরা ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে থাকে। প্রশ্ন উঠতে পারে, ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া তারা কি বিকল্প কোন পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারতো ? যে যে বিকল্প পদ্ধতি তারা অবলম্বন করতে পারতো সেগুলি হতে পারে নিম্নরূপ।

১. তারা ঘোষণা করতে পারতো যে যারা বেশি ডোনেশন দেবে তাদের ভর্তি করা হবে। (এটি হতো একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি)।
২. তারা বলতে পারতো যে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রার্থী বাছাই করে দেবে।(এটি হতো একটি রাজনৈতিক দুর্নীতি)।
৩. তারা বলতে পারতো যে জেলা প্রশাসক বা স্থানীয় শিক্ষা প্রশাসক প্রার্থী বাছাই করে দেবে। (এটি হতো একটি রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি) ।
৪. তারা লটারী বা অন্য কোন ধোয়াসা মার্কা পদ্ধতির কথা বলে গোপনে কিছু কালেকশন করতে পারতো। (এটি হতো একটি ব্যক্তি পর্যায়ের দুর্নীতি)।

উপরের একটি পদ্ধতিও তাদের ভালো মনে হয় নাই বলে নিরুপায় হয়ে তারা ভর্তি পরীক্ষা নিয়েছে বা নিচ্ছে । এবার আসা যাক, ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের আলোচনায়। যে ক্লাসের জন্য তারা শিক্ষার্থী নেবে ছাত্রের শুধুমাত্র সেই ক্লাসে পড়ার জ্ঞান থাকলেই চলে। কিন্তু সেই জ্ঞানের পরীক্ষা নিলে সবাই বা অনেকেই পূর্ন নম্বর পেয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তাদের করণীয় কি ? একটু কঠিন প্রশ্ন করা ছাড়া তারা আর কোন বিকল্প খুজে পায়নি।

"যারা ভর্তি হতে আসাবে তাদের সবাইকে তাদের ভর্তি করে নেয়া উচিত"। এটি একটি আদর্শ এবং সুন্দর প্রস্তাব। কিন্তু বিদ্যমান পটভূমিতে সেটা কি সম্ভব ? সোজা সাপটা উত্তর "না"। তবে আমরা একটু ভালভাবে চিন্তা করলে বুঝবো, এটা আসলে সম্ভব। সেই সঙ্গে বিশেষ ভাবে চিন্তা করলে বুঝবো, বিশেষ কারণে এটি এদেশে সফল হবে না। সাধারণ ভাবে আমরা জানি, ঢাকা শহরের সকল শিশুর ভালোভাবে লেখাপড়া করার জন্য অনেক ভালো স্কুল প্রয়োজন। এজন্য দরকার ভালো স্কুল ভবন, মানসম্মত শিক্ষক এবং আরো অনেক কিছু। আর এ জন্য প্রয়োজন প্রচুর টাকা। আমরা জানি এই মূহুর্তে সরকারের হাতে এই খাতে খরচ করার জন্য অত টাকা নেই। আমরা আরও জানি যে, দুর্নীতিপরায়ন দেশের সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে, তারা কখনও "বিরাট ব্যয় সাপেক্ষ প্রকল্প" ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না । এখানে দুঃখের বিষয় হলো, এই বিশেষ পদ্ধতিটি অনেক কম খরচে, বা বলা যায় নামমাত্র খরচেই বাস্তুবায়ন যায়।

এখন এই পদ্ধতির কথা আলোচনা করা যাক। একটি মানসম্মত স্কুলে ভর্তি হতে না পেরে ঢাকা শহরের অনেক শিশু যখন বিষন্ণতায় ভোগে শহরের দামি দামি স্কুল ভবনগুলি তখন ফাঁকা ঘরে নিশ্বাস ফেলে। কারণ দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ছয় বা সাত ঘন্টা ব্যবহারের পর এগুলি অলস ভাবে পড়ে থাকে, আর মৃত্যুর প্রহর গোনে। আমরা জানি, কোন কোন 'দামি' স্কুল আয় বাড়াতে বিভিন্ন স্থানে তাদের শাখা খোলে, কখনও কখনও দ্বিতীয় বা তৃতীয় শিফটও খোলে। এতে তাদের তাদের আর্থিক চাহিদা মেটে, কিন্তু ঢাকার শিশু শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন কি মেটে ?

এবারে উপরে উল্লেখ করা পদ্ধতিটির কথা একটু বিস্তারিতভাবে বলা যাক। ধরা যাক, সরকার সকল সরকারি বা বেসরকারি ভবনে স্কুল পরিচালনার ক্ষেত্রে কতকগুলি নিয়ম করে দিয়েছে। যেমন,

(১) “বি এম ও” – প্রতিটি স্কুল ভবনের একেবারে সামনের দিকে থাকবে একটি অফিস যার নাম হবে "বিল্ডিং মেইন্টেনেন্স অফিস" বা সংক্ষেপে “বি এম ও”। এটা হবে এমন একটি অফিস যেখানে চব্বিশ ঘন্টা দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরা থাকবে। সার্বক্ষণিক কাজের জন্য এই অফিসে তিন সেট স্টাফের প্রয়োজন হবে, যাদের মধ্যে থাকবে একজন ম্যানেজার এবং তার কয়েকজন সহকারী। এই অফিস স্কুল ভবনের যাবতীয় মেইনটেনান্স কাজ করবে এবং এদের কাছে থাকবে সকল কক্ষের চাবি। অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা অনুমোদিত সময়ে ব্যবহারের জন্য এই চাবি নেবে এবং বিভিন্ন কক্ষ ব্যবহার করবে ।

(২) কক্ষ ও আসবাব - সাধারণভাবে পাঠদান কক্ষের আসবাব বর্তমানের মতই হবে। কিন্তু শিক্ষকদের এবং অফিস হিসেবে ব্যবহৃত কক্ষের আসবাবগুলি হবে একটু অন্য রকম । যেমন এই সব কক্ষে, (ক) টেবিল চেয়ারসহ সকল আসবাব সাধারণভাবে ব্যবহার করা যাবে এবং কোথাও কোন কিছু তালা দিয়ে রাখা যাবে না। (খ) আলমিরা বা লকার যাতে অফিসের, প্রধান শিক্ষকের বা সাধারণ শিক্ষকের ব্যবহারের জিনিস তালাবদ্ধ করে রাখা হবে, সেক্ষেত্রে প্রতিটি জিনিস হবে তিনটি করে।

(৩) সময়কাল বা শিফট- প্রতিটি স্কুল দিনে তিনবার আলাদা আলাদা স্কুল হিসেবে পরিচালিত হবে। এদের সময়কাল হতে পারে - (ক) সকাল - সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ১১টা ।(খ) দুপুর - বেলা ১২টা থেকে সাড়ে ৫টা এবং (গ) বিকাল - বিকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা।

(৪) শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী – প্রতিটি শিফটে আলাদা আলাদা শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর টিম এসে ‘বি এম ও’ থেকে চাবি নিয়ে স্কুল পরিচালনা করবে। শিফট শেষ হবার পর ‘বি এম ও’–এর কর্মচারীরা দ্রুত সব কিছু পরিষ্কার করে পরবর্তী টিমের জন্য স্কুল ভবনকে প্রস্তুত করবে। বর্তমানে প্রতিটি স্কুলে একটি পরিচালনা-যন্ত্র (মেকানিজম) আছে। স্কুলভবনটি কোন স্কুল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ভবন হলে এই স্কুলের ‘বি এম ও’ অফিসটি এবং স্কুলের প্রথম শিফট এই কর্তৃপক্ষের হতে পারে। বাকি দুইটি শিফট পরিচালিত হবে অন্য টিমের দ্বারা। কোন ক্ষেত্রেই একটি টিমকে এক বা একাধিক স্কুলে একাধিক শিফট চালানোর অনুমতি দেয়া হবে না।

(৫) বিভিন্ন শিফটের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী টিম– প্রথম বা মূল শিফট পরিচালনার দায়িত্ব বর্তমানের মতই মূল মালিকদের হাতে থাকবে। দুপুর এবং বিকালের শিফটের জন্য উপযুক্ত যোগ্যতা সম্পন্ন আগ্রহী ব্যক্তিগণ নিজেরা টিম গড়ে নির্ধারিত ফর্মে সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করবে। সরকারি কর্তৃপক্ষ আবেদনকারী সদস্যদের যোগ্যতা এবং আর্থিক সক্ষমতা বিচার করে বিভিন্ন শিফটে স্কুল পরিচালনার অনুমতি প্রদান করবে। তাদেরকে প্রতিটি শিফটে ভবনের কক্ষ ব্যবহারের জন্য ‘বি এম ও’ অফিসকে নির্ধারিত হারে ভাড়া দিতে হবে। তারা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত হারে ছাত্রদের কাছ থেকে বেতন ও অন্যান্য খরচ নিতে পারবে, যা বিভিন্ন শিফটের ক্ষেত্রে ভিন্ন হবে।

(৬) শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগ্যতা নির্ধারণ- (ক) সকালের বা যে শিফটে মূল স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুল পরিচালনা করবে তাদের ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগ্যতা তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। তবে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে কোন তৃতীয় বিভাগ থাকা চলবে না এবং শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে দুর্নীতি বা অন্যায়ের জন্য শাস্তিপ্রাপ্তদের নেয়া যাবে না।

(খ) দুপুর – এই শিফটের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ শিক্ষক থাকতে পারবে উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন গৃহিনী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র যাদের বিশেষ সময়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ এবং অনুমোদন আছে ইত্যাদি। তবে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তৃতীয় বিভাগ এবং সকলের ক্ষেত্রে দুর্নীতি বা অন্যায়ের জন্য শাস্তিপ্রাপ্তরা গ্রহণযোগ্য হবে না।
(গ) বিকাল - এই শিফটের শতকরা পঁচাত্তর ভাগ শিক্ষক থাকতে পারবে উপরোক্ত যোগ্যতা ব্যক্তিরা। অন্য শর্ত উপরের মতই।

বর্তমানে ঢাকায় বিভিন্ন নামী স্কুল তাদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় শাখা খুলছে। অনেকে অন্য স্কুলে নিজেদের “নাম” ব্যবহারের জন্য টাকা আদায় করছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এরা নানা শাখা বা শিফট খুলেই কি বর্তমান প্রয়োজন মেটাতে পারে না ? এর এক কথায় উত্তর “না” । এখানে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে এভাবে স্কুল খোলা বা শিফট বাড়ানো হলে তা উদ্যেক্তাদের আর্থিক চাহিদা এবং শিশু শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি করবে, কিন্তু শিক্ষার মান বৃদ্ধি করবে এমন কোন গ্যারান্টি নেই । কারণ এখানে যা প্রাধান্য বিস্তার করে তা হলো, মনোপলি এবং ইমেজ। অপর পক্ষে উপরে যে প্রস্তাব করা হয়েছে সেখানে যা প্রাধান্য রাখবে তা হলো প্রতিযোগিতা।

বিভিন্ন শিফটে স্কুল পরিচালনা করা নতুন নতুন টিম জানে তাদের টিকে থাকা বা ভালোভাবে টিকে থাকা নির্ভর করে তাদের দেয়া শিক্ষার মানের উপর, এবং কিছুটা কম খরচের উপর। শহরে নতুন নতুন স্কুল ভবন তৈরি করে শিক্ষাদান করার চেয়ে এটা যে কম ব্যয় সাপেক্ষ, এতে যে শহরের মূল্যবান ভূমি কম ব্যবহার করা হয়, শিক্ষার্থীরা উন্নত সুযোগ সুবিধা (খেলার মাঠ, ভালো শ্রেণি কক্ষ ইত্যাদি) পাবার সুযোগ পায় তা সহজেই বোঝা যায়। সহজেই বোঝা যায় যে বিভিন্ন ‘স্কুলের মালিক প্রথম টিম’ নানা সুবিধার কারণে এমন কি খারাপ শিক্ষা দিয়েও হয়তো টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু অন্য শিফটের টিম টিকে থাকবে কেবল মাত্র ভালো শিক্ষাদানের কারণে। এদিকে মূল মালিক বিএমও-র মাধ্যমে তার ভবন থেকে কিছু অতিরিক্ত অর্থ পাবার কারনে তাদের দাবি করা শিক্ষার খরচ কমানোর সুযোগ পাবে।

উপসংহারঃ দেখা যাচ্ছে উপরের প্রস্তাবটি বাস্তুবায়ন করার জন্য যা প্রয়োজন তা হচ্ছে, সরকারের পক্ষে কতকগুলি সুন্দর এবং বুদ্ধিদীপ্ত আইন প্রনয়ন করা, সরকারের পক্ষে এগুলি কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য কিছু সৎ, নিষ্ঠাবান এবং উদ্রোগী কর্মকর্তা নিয়োগ এবং সামান্য টাকা। জনগণের সহযোগিতার কথা এখানে বলাই বাহুল্য। এই পদ্ধতি বাস্তুবায়িত হলে জনগণ নানা কারণে উপকৃত হবে। যেমন, সাধারণভাবে শিক্ষার ব্যয় কমবে, অনেকেই তাদের নিজ এলাকার কাছে স্কুল পাবে, অনেক অভাবী মানুষ সৎ ভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাবে। তাই এধরনের প্রোগ্রামে জনগণের সহযোগিতা থাকবে।

আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় । ঢাকা ।

ব্রেকিংনিউজ/এমএইচ



আপনার মন্তব্য

মুক্তমত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং