Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

সোমবার ২৬ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, পূর্বাহ্ন

প্রচ্ছদ » মুক্তমত 

পিনাক ডুবি ও আমার অভিজ্ঞতা

পিনাক ডুবি ও আমার অভিজ্ঞতা
সুব্রত মণ্ডল ০৭ আগস্ট ২০১৫, ৪:২৭ অপরাহ্ন Print

৩ আগস্ট ২০১৪ । আমি ঢাকা ফিরছি পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটি কাটিয়ে। পুরো ছুটি শেষ হয়নি। ক্লাস শুরু হতে আরও কিছুদিন বাকী আছে। কিন্তু পত্রিকা অফিসের চাপেই রওনা হয়েছি এদিন দুপুরে। দিনটি ছিল দুর্যোগপূর্ণ। আকাশে প্রচণ্ড মেঘ। মা বাড়ি থেকে বলে দিয়েছেন যেন লঞ্চ না যাই।

কাওড়াকান্দি ঘাটে পৌঁছতেই শুরু হল প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস। সঙ্গে বৃষ্টি। ঘাট থেকে তেমন একটা লঞ্চ ছাড়ছে না। দীর্ঘক্ষণ পর পর ছাড়ছে লঞ্চ। স্পিড বোট লঞ্চের তুলনায় বেশি ছাড়ছে। ভাড়াও বেশি- ২০০ টাকা। স্বাভাবিকের তুলনায় ৮০ টাকা বেশি। তাই বাধ্য হয়েই ফেরিতে উঠি। ফেরিটি প্রচণ্ড বাতাসের মধ্যেই কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে রওনা হল।

আমি সাধারণত ফেরি পারাপার হলে ফেরির উপরের ছাদে বসে যাই। বৃষ্টির দিনেও এর হেরফের হল না। ফেরি কিছু দূর এগোতেই দেখি আমার এক শিক্ষক শাখাওয়াত হোসেন স্যার। সাখাওয়াত হোসেন স্যার ঢাকা ইম্পিরিয়াল কলেজের পদার্থ বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। ২০০৮ সালে আমি যখন জিপিএ-৫ পেয়ে ঢাকা ইম্পিরিয়াল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হই। তখন স্যারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এ কলেজের বর্তমান গণিত বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মৃধা।

যাই হোক, স্যারকে আমি দীর্ঘ ৪ বছর পর দেখলাম। ফেরিতে সিট না থাকায় স্যারকে আমি আমার সিটে বসতে দেই। স্যার আমার ও আমি তার কুশল জিজ্ঞাসা করলাম। আমি দাঁড়িয়ে স্যারের সঙ্গে গল্প করছি আর ফেরিটি একটু একটু করে মাওয়ার দিকে এগুচ্ছে। ফেরিটি পদ্মার মাওয়া পয়েন্টের হাজরা চ্যানেলের মুখে চলে এলে তীব্র ঘূর্ণি স্রোতের মুখে পড়ে। ফেরিটি এগুতে পারছিল না। ঘূর্ণি স্রোতের সঙ্গে তীব্র বাতাস। বহুকষ্টে সারেং হাতের বা-দিকে ফেরিটিকে চর ঘেষিয়ে ঘাটের উত্তর দিক হয়ে এগুচ্ছে। এভাবে ২০ মিনিটের পথ প্রায় ১ ঘণ্টা লেগে গেল।

এসময় আমি কোথায় কী করছি স্যার তা জানলেন। স্যার গল্প করার সময় কয়েকজন মন্ত্রী সম্পর্কে কথা বললেন। তিনি আমাদের মাদারীপুর সদরের সংসদ সদস্য ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শাজাহান খানের কথা বললেন। মন্ত্রীকে দিলখোলা মনের মানুষ বলে অভিহিত করলেন স্যার। আমি খুশি হলাম। কারণ ঢাকায় বসবাসরত মানুষের মধ্যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ভিত্তিহীন কথিত দুর্নীতি নিয়ে মাদারীপুরের মানুষের প্রতি বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে।

আমাকে স্যার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সঙ্গে যোগাযোগ আছে? আমি বললাম, হ্যা আছে। আমি তার মন্ত্রীপাড়ার কোয়াটারে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। মোবাইল ফোনে মাঝে মাঝে কথা হয়। তখন স্যার আমার কাছ থেকে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি নিনেল। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর মোবাইল নম্বর নিলেন।

ফেরি ঘাটে পৌঁছলে স্যার নেমে পিরোজপুর-ঢাকা রোডের গাড়িতে উঠলেন। আমি স্যারকে বিদায় দিলাম। যেহেতু পিনাক-৬ নিয়ে লিখতে বসছি। সেহেতু এ কথাগুলো আপনারা অপ্রাসঙ্গিক মনে করছেন বলে মনে হতে পারে। আমি বলে নেই, এমএল পিনাক-৬ লঞ্চডুবি হয়েছিল ৪ আগস্ট। আমি যে দিন ঢাকা যাই ঠিক তার আগের দিন। ৩ আগস্ট। পিনাক-৬ ডুবির সময় পদ্মার কি অবস্থা হয়েছিল তা আমার থেকে ভালো অন্য কোন সাংবাদিকের জানার কথা নয়। পিনাক-৬ ডুবির পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বাঘা বাঘা ক্রাইম রিপোর্টাররা প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তা তাদের স্ব স্ব পত্রিকায় বিশেষ আয়োজনে প্রকাশিত হয়েছে।

আমি হলফ করে বলতে পারি, এদের ৮৫ শতাংশ সাংবাদিকের পিনাক-৬ ডুবির মাধ্যমে সর্বনাশা পদ্মার সঙ্গে বাস্তবে সাক্ষাৎ হয়েছে। এদের কেউ জীবনে একটি বারের জন্য লঞ্চে ওঠেননি। কিছু সিনিয়র সাংবাদিকও যদি বর্ষার দিনে এ মাওয়া-কাওড়াকান্দি দিয়ে পার হন, তবে তারা ফেরিতে পার হন। তাই লঞ্চে কী রকম পরিবেশ সৃষ্টি হয় তা তাদের ধারণা নেই। এদের অনেকেই আছেন সাঁতার জানেন না। তবে এদের মধ্যে যে কজন সাংবাদিক কাজ করেছেন আমার জানা মতে, সমকালের আতাউর রহমান (আতা ভাই) বেশি অভিজ্ঞ। কারণ তার বাড়ি শরীয়তপুর। আতা ভাই পদ্মায় সাঁতার কাটা ছেলে। যুগান্তরের জেবেল ভাই অনেক বার এসেছেন এ নৌপথে। তারও অভিজ্ঞতা আছে।

লঞ্চে পদ্মা পারাপারের দৌড়ের অভিজ্ঞতায় আমিও অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। তাই অনেক প্রতিবেদন আমরা পেয়েছি অতিরঞ্জিতভাবে। কিছু প্রতিবেদনে ইচ্ছাকৃতভাবে নিখোঁজদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রতিবেদনগুলাতে মফস্বলের কয়েকজন সাংবাদিক বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন বলে জানা গেছে। তা প্রমাণিত হয়েছে একই দিন ঔ সকল মিডিয়ায় প্রকাশিত একই বিষয়ে একাধিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, যারা বিভ্রান্তমূলক প্রতিবেদন করেছেন তাদের কাউকে পিনাক-৬ ডুবির পর ঘটনার আশেপাশে দেখা যায়নি। এদের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে অদ্ভুত সব তথ্য। তাই অধিকাংশ প্রতিবেদনেই দেখতে পাই, ঘটনার সব দোষ চাপানো হয়েছে লঞ্চ মালিক ও ঘাট ইজারাদারদের। কারণ আমরা ভালো করেই জানি, এ দু’শ্রেণির লোকেরা বেশি মুনাফা চায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ মুনাফার হার আমরা যাত্রীরাই বাড়িয়ে দিই। বাড়তি ভাড়া দিচ্ছি অহরহ। সেই সঙ্গে বাড়তি যাত্রী হয়েও লঞ্চে উঠছি। জীবনের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছি। সব ধরনের অপকর্মের সুযোগ আমরা যাত্রী সাধারণরাই দিচ্ছি। দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু মালিক ও ঘাট কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করি। আসলে কি তাই? আমরা যাত্রীরা কি একেবারে ‘ধোয়া তুলসি পাতা’? সবকিছু মিলিয়েই এর দায়ভার যথাযথ কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না।

লেখক: সাংবাদিক।

ব্রেকিংনিউজ/এসইউএম



আপনার মন্তব্য

মুক্তমত বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং