Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

রবিবার ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, পূর্বাহ্ন

প্রচ্ছদ » সম্পাদকীয় 

প্যারিস হামলা কতটা দায়ী আইএস কতটা বিশ্ব মোড়লরা

প্যারিস হামলা কতটা দায়ী আইএস  কতটা বিশ্ব মোড়লরা
মহিউদ্দিন আহামেদ ১৫ নভেম্বর ২০১৫, ৬:৪৫ অপরাহ্ন Print

ফ্রান্স, উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই বিশ্বে পরিচিত। এক সময় বিশ্ব মোড়লের ভূমিকায়ও ছিল তারা। গত কয়েক বছর যাবত বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে তারা। ঘটনার শুরু ব্যঙ্গাত্মক পত্রিকা শার্লি এবদোর অফিসে হামলার মধ্য দিয়ে। এর আগেও হামলা হয়েছে তবে তা ইসলামি জঙ্গী গোষ্ঠীর মদদে হয়নি। এবদোর ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১৭ জন।

সেই হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র দশমাসের মধ্যে আবারও ভয়াবহ জঙ্গি হামলার সাক্ষী হল ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস৷ তার আগে অবশ্য গত মার্চে একটি সুপারমার্কেটে আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় নিহত হয় ৩ জন। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে গেছে গত শুক্রবারের হামলা, তাতে নিহত হয়েছে ১৫০ জনের অধিক মানুষ।

হামলার পরপরই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নিন্দার ঝড়। তাতে যোগ দিয়েছে বিশ্বের সাধারণ নাগরিকরাও। কিন্তু আমাদের মধ্যে কতজনই বা জানার চেষ্টা করছেন কেন এই হামলা। কোন কোন ব্যাপার এই হামলার পিছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। কারা-ই-বা এই হামলায় পরোক্ষভাবে লাভবান হচ্ছে।

প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যার মহোৎসব শুরু হয় ইসরায়েলী বাহিনী কর্তৃক ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে হত্যার মাধ্যমে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর আধিপত্য বিস্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাত দিয়ে উত্থান ঘটে আল-কায়েদা নামের একটি সংগঠনের। যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার বৈরী সম্পর্কের ফসল এই আল-কায়েদা। পরে আবার তাদেরকে নিধনের জন্যই আফগানিস্তান আর তার প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানকে বোমা আর গুলির আঘাতে জর্জরিত করে দেয়া হয়। দেশ দুইটি এখন সন্ত্রাসীদের বিচরণ ভূমি বলেই সবার কাছে পরিচিত।

আর আইএস এর জন্ম তো বর্তমান বিশ্বের মানুষের একেবারে চোখের সামনে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের নিমিত্তে ইরাক যুদ্ধ, লিবিয়া যুদ্ধের ঠিক পরপরই গোপনে গঠন করা হয় আইএস নামক একটি জঙ্গী গোষ্ঠীর। প্রথম প্রথম যখন তারা প্রভুর (যুক্তরাষ্ট্রের) নির্দেশ মত কাজ সম্পন্ন করত, তখন কিন্তু তাদেরকে জঙ্গী গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হত না আর বিশ্ব গণমাধ্যমও সেটি দেখতে পেত না। কিন্তু তখনও তারা সেই কাজই করত, এখন তারা যা করছে।

সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে সরাতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র যখন আইএসকে (তাদের ভাষায় স্বাধীনতাকামী) বিপুল পরিমাণ সাহায্য সহযোগিতা শুরু করল, তখন সংগঠনটি ফুলে-ফেঁপে নিজেই স্বতন্ত্রভাবে নিজেদের কাজকর্ম পরিচালনা করতে শুরু করে। তবে আই-এস বিশ্ববাসীর নজর কাড়ে প্রকাশ্যে বিভিন্ন মানুষের গলা কাটার মধ্য দিয়ে। আর অর্থের সংস্থান করতে লাগল তেল খনি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড (মানুষ জিম্মি) ঘটানোর মাধ্যমে।

আইএস নিয়ে আলোচনায় প্রথমেই যে বিষয়টি সবার মনে আসে তা হল তারা এত সংগঠিত আর দুর্ধর্ষ কেন? মনে রাখতে হবে যখন আল কায়েদা সক্রিয় ছিল তখন তাদের বেশির ভাগ লোকবল সংগ্রহ হত মধ্যপ্রাচ্য আর এশিয়া থেকে। তাই ওই সময় গুলোতে সেই সব অঞ্চলেই কিন্তু সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসী হামলা হত। কিন্তু আইএস গঠনের পর সেখানে সবচেয়ে বেশি জনবল সংগ্রহীত হচ্ছে ইউরোপ আর পশ্চিমা অঞ্চল থেকে। তাই গত কয়েক বছরে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে এদের দ্বারা হামলার বেশির ভাগই কিন্তু ওই অঞ্চলে হচ্ছে। আর আইএসএ যোগ দেয়া উল্লেখ যোগ্য পরিমাণ জিহাদী কিন্তু ফরাসি নাগরি।

তাই প্যারিস হামলায় সিরিয়ার জিহাদিদের যোগ থাকার কথা ওঠায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বিদ্রূপের সুরে বলছেন, ফ্রান্সে বাইরে থেকে জিহাদি আসার দরকার কী? ফ্রান্স-ই তো জিহাদি সরবরাহ করে থাকে৷

এছাড়া সিরিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে৷ ফরাসি বিপ্লবের পর বহুদিন পর্যন্ত ফরাসি দখলে ছিল সিরিয়া৷ এখনও সিরিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে দুই দেশের নাগরিকদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে৷

আরেকটি বিষয় হচ্ছে ফ্রান্সের ইসলামিক স্টেটস এ যোগদান৷ পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে ফ্রান্স থেকেই সর্বাধিক যোগ দিয়েছে ইসলামিক জিহাদি গোষ্ঠীতে৷ চলতি বছরের এপ্রিলে ফরাসি সিনেটের একটি রিপোর্ট বলা হয়েছে ৩ হাজারের কিছু বেশি ইউরোপীয় জিহাদি আইএসআইএস-এর হয়ে লড়তে সিরিয়া ও ইরাকে গিয়েছে৷ এর মধ্যে ১৪৩০ জনই গিয়েছে ফ্রান্স থেকে৷ সংবাদ সংস্থা এএফপি'র বছরের শুরুর দিকে একটি সংবাদে দাবি করে, ফরাসি গোয়েন্দারা ১৫৭০ জন নাগরিকের উপর নজর রেখেছে৷ গোয়েন্দাদের অনুমান, সিরিয় জিহাদি নেটওয়ার্কের সঙ্গে এদের কোনও না কোনোভাবে সংযোগ রয়েছে৷ এছাড়া, আরও ৭ হাজার এই পথে যাওয়ার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে৷

আর গত শুক্রবার যে হামলা হয়েছে, তাতে যারা হামলাকারী তারা সবাই সম্ভবত ফারসি নাগরিক।এর মধ্যে একজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে সে ফরাসি নাগরিক। তাহলে ব্যাপার কি দাঁড়াল। ওই দেশে যারা হামলা চালিয়েছে তারা ওই দেশেরই নাগরিক। তার মানে ওই দেশের অনেক কর্মকাণ্ডের সাথে নিজ দেশের নাগরিকরাই এক মত হতে পারছেন না। তাই তারা চরম পন্থা বেছে নিচ্ছেন।

আর প্যারিসে হামলার পরপরই বেশ কিছু তথ্য মানুষ জানতে পারছে বিশ্ব নেতাদের কাছ থেকে। যেমন এখন ওবামা বলছেন, আইএস উত্থানের জন্য বুশ দায়ী। বাশার আল আসাদ বলছেন, প্যারিস হামলার জন্য ফরাসি নীতিই দায়ী। আবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো খুব জোড়ের সঙ্গে বলেছেন, আইএসের পেছনে আছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।

আর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, ফ্রান্স সরকার মৌলবাদ-বিরোধী প্রচার চালালেও দেশের ৪০.৭০ লক্ষ জনসংখ্যার (মোট জনসংখ্যার ৭.৫ শতাংশ) নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে৷ অবহেলিত শ্রেণির যুবক, মহিলারা শিক্ষা, চাকরি, বসবাসের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে৷ ২০১০ সালে সরকার প্রকাশ্যে সম্পূর্ণ মুখ ঢাকা বোরখা নিষিদ্ধ করে৷ এমন কিছু ঘটনায় মুসলিম সম্প্রদায়ের ধারণা হয়, ধর্মনিরপেক্ষ সরকার তাদের ইসলাম ধর্মাচরণ থেকে আটকানোর চেষ্টা করছে৷ এর থেকেই তাদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, জিহাদিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি এই ‘ধর্মীয় আচরণের' স্বাধীনতার দিকেও ফ্রান্স সরকারের মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া ইসলাম ধর্মের নবীকে নিয়েও সেখানে মুক্ত বুদ্ধির চর্চা আর বাক স্বাধীনতার নামে যা হয়েছে তাও নিশ্চয় ওই হামলাগুলোর পিছনে ভূমিকা রেখেছে।



আপনার মন্তব্য

সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং