Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

রবিবার ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, পূর্বাহ্ন

প্রচ্ছদ » সম্পাদকীয় 

সংকট নিরসনে প্রয়োজন গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা

সংকট নিরসনে প্রয়োজন গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা
মো. মাইনুল ইসলাম ১৭ জানুয়ারী ২০১৫, ৬:৪০ অপরাহ্ন Print

গণমাধ্যম ব্যতীত বর্তমানে আমাদের জীবন প্রায় অসম্ভব। বলা চলে এটি আমাদের জীবনকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, যে দেশে সংবাদপত্র স্বাধীন, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না। তার এ বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গণমাধ্যম ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

মিডিয়ার কাজ সরকার ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভুল-ত্রুটিগুলো তুলে ধরা। মানুষ প্রত্যাশা করে সরকারি, বেসরকারি, বহুজাতিক বা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান- যাদের কাজের সঙ্গে জনগণের স্বার্থ জড়িত মিডিয়া তাদের কাজের উপর নজরদারি রাখবে, জনবিরোধী বা কোন অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতি হলে সেসবের সমালোচনা করবে। মিডিয়াকে তাই ‘আই অব গভর্নমেন্ট’ বা ‘ওয়াচ ডগ’ বলা হয়।

গণমাধ্যম মানুষের মনোজগৎ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে মিডিয়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ফলাফল বদলে দিতে পারে। স্বাধীন দেশে মিডিয়া কতটুকু জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে, তা নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর। কেননা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর মুক্ত গণমাধ্যম একে অন্যের পরিপূরক। দুটোই একে অন্যকে প্রভাবিত করে।

সংবাদপত্রের মূল দায়িত্ব হলো, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কথা বলা, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মুখপত্র হিসাবে কাজ করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো বাংলাদেশে এখন বেশিরভাগ গণমাধ্যমই নিরপেক্ষ নয়। তারা নিজের স্বার্থ ও দৃষ্টিকোণ থেকে সংবাদ প্রকাশ করে। এমনকি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সাংবাদিকরাও আজ দ্বিধাবিভক্ত।

সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে সাংবাদিককের পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ড ছিল দৃষ্টিকটু। সাংবাদিকদের এক পক্ষ বলেন, মির্জা ফখরুল প্রেস ক্লাব থেকে চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে আমাদের অনুরোধে থেকে যান। অন্য পক্ষের বক্তব্য, প্রেস ক্লাবকে বিএনপির আন্দোলনের বিকল্প প্লাটফরম হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের প্রতিরোধে সেটি সম্ভব হয়নি।

দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটকে সামনে রেখে জাতি যখন স্পষ্টভাবে বিভাজিত হয়ে সংঘাত-সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে, তখন সংকট সমাধানে একটি ন্যূনতম মতৈক্যে পৌঁছাতে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালনেও ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম। একপেশে ও একচেটিয়া প্রচারণার কারণে প্রকৃত অবস্থা ও ঘটনা জানতে পারছে না সাধারণ মানুষ। অধিকাংশ সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পক্ষপাতমূলক প্রচারণার কারণে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনমতের প্রতিফলন ঘটছে না। সরকারি দলের অনুগত মিডিয়া একতরফা পক্ষপাতমূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে, পক্ষান্তরে বিরোধীদলের প্রতি সংবেদনশীল, জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মিডিয়াগুলো নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে।

গণমাধ্যমের ওপর সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ এখন অনেকটাই 'প্রকাশ্য গোপনীয়তা'। যদিও তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ও বিস্তৃতির কারণে পুরো বিশ্ব এখন ভুবন গাঁয়ে পরিণত হয়েছে। তাই সরকারের শত নিয়ন্ত্রণ ও বাঁধা সত্ত্বেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখন ধামাচাপা রাখা প্রায় অসম্ভব।

বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন গণমাধ্যমের মূল লক্ষ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। অথচ বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় ঐক্য ও জনমতের প্রতিফলনের বদলে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণায় লিপ্ত থাকার প্রবণতা বেড়ে গেছে।

দু’টি বিভক্ত ও পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে মিডিয়া ও সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন সংকট সমাধানে এগিয়ে আসার প্রত্যাশা করছে, তখন সংকট সমাধানে নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এক শ্রেণীর মিডিয়ার পক্ষপাতপূর্ণ ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরো জটিল ও সংঘাতপূর্ণ করে তুলছে।

গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রের চতুর্থস্তম্ভ হিসেবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় গণমাধ্যমকে অগ্রবর্তী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে। কোনো পক্ষের উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা বা সস্তা আবেগের সাথে সুর মেলানো সংবাদমাধ্যমের কাজ নয়। জাতির এই সংকটময় ক্রান্তিকালে দেশের মানুষ সাংবাদিক সমাজ ও গণমাধ্যমের কাছে নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও জনকল্যাণমূলক ভূমিকা প্রত্যাশা করে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সর্বস্তরের মানুষ। হরতাল-অবরোধসহ সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে ইতোমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন বহু লোক। ব্যাহত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, আয়-রোজগার ও নিরাপত্তা। কিন্তু চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কোনোরকম লক্ষণ দৃশ্যত চোখে পড়ছে না। ফলে দেশের আপামর মানুষের দিন কাটছে গভীর উৎকণ্ঠার মধ্যে।

দেশে চলমান রাজনৈতিক সংকট ও দেশের মানুষের উৎকণ্ঠা নিরসনে গণমাধ্যমকে অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে। জনগণকে বিভ্রান্ত না করে তুলে ধরতে হবে প্রকৃত চিত্র। অন্যথায় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের একপেশে অবস্থান দেশকে আরও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সম্পাদক,
ব্রেকিংনিউজ ডটকম ডটবিডি
বিজয় নগর, ঢাকা।



আপনার মন্তব্য

সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং