Facebook   Twitter   Google+   RSS (New Site)

রবিবার ২১ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, পূর্বাহ্ন

প্রচ্ছদ » সম্পাদকীয় 

উপ-সম্পাদকীয়

কত দীর্ঘ হলে থামবে সড়কে মৃত্যুর মিছিল?

কত দীর্ঘ হলে থামবে সড়কে মৃত্যুর মিছিল?
১৫ এপ্রিল ২০১৪, ৯:৪২ অপরাহ্ন Print

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমুড় এলাকায় ট্রাক-লেগুনার মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো পাঁচ জন। ভোলা-ভেলুমিয়া সড়কের সমিতিরহাট এলাকায় নছিমনের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা গেছে এক ইউপি সদস্য। কুষ্টিয়া-পাবনা মহাসড়কের ভেড়ামারা উপজেলাধীন মসলেমপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক। টঙ্গী থানার আশরাফ সেতুর সামনে ট্রাক চাপায় গুরুতর আহত হয়েছে দুই পথচারী ।

এই চিত্র শুধু মঙ্গলবার সকালের!

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সড়কগুলো এখন মৃত্যুফাঁদ। এমন কোনো দিন আমরা অতিবাহিত করি না যেদিন সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া যায় না। প্রতিদিন সংবাদপত্র ও টিভি খুললেই সারা দেশে এমন দুর্ঘটনার খবরের অভাব থাকে না। আবার গণমাধ্যমগুলোতে সংবাদ হয় না এমন দুর্ঘটনার সংখ্যাও কিন্তু হাজার হাজার। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও তাদের সহকারীদের শাস্তি না হওয়া এবং মোটরযান নিয়ন্ত্রণে দুর্বল আইন এ অবস্থার জন্য দায়ী বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা মহামারীর আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটছে গাড়িচালকের অসতর্কতা ও বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। আর প্রতিদিন এত এত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়ার পরও কেন থামছে না এই হত্যাযজ্ঞ, কেন দিন দিন বেড়েই চলেছে? কারণ এর বিপরীতে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে আটজনের বেশি মৃত্যুবরণ করে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এমন ভয়াবহ চিত্র কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, যার ফলে মারা যায় প্রায় তিন হাজার থেকে তিন হাজার তিন শত জন এবং মারাত্মক আহত হয় প্রায় দুই হাজার দুই শত থেকে আড়াই হাজার জন। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই প্রতি বছর তিন শত ৮০ জন মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। জাতীয় পঙ্গু, অর্থপেডিক্স ও পুনর্বাসন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে দেশে পঙ্গুত্বের হার ১৫ ভাগ। এসব দুর্ঘটনার শিকার হওয়া হতভাগ্যদের মধ্যে প্রায় ৫৪ ভাগ শিশু। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে আমাদের জিডিপি কমে প্রতি বছর ২ ভাগের মতো, যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

সড়ক দুর্ঘটনায় মিশুক মুনির, তারেক মাসুদ অথবা ভিআইপি-সিআইপি নিহত হলেই আমরা উদ্বিগ্ন হই, সংবিধান নিয়ে বসি। অন্য মৃত্যুগুলো যেন আমাদের কাছে সংখ্যামাত্র! এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত ১৮ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ। আর দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে প্রায় এক লক্ষ।

প্রতিবার দুর্ঘটনার পর নামমাত্র একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। একটি দুর্ঘটনারও বিচারের দৃষ্টান্ত মেলে না। শাস্তি হয় না দোষীদের । ফলে বিচার ও প্রতিকারহীন কোন কিছুর পুনরাবৃত্তি অবধারিতভাবেই ঠেকানো যায় না, ঘটতেই থাকে, নিশ্চিন্তে, মহাসমারোহে।

আর এই দুর্ঘটনাগুলো শুধু মৃত্যু ও শারীরীক পঙ্গুত্বই সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে একেকটি পরিবারকে। অসহায় এসব পরিবারের পাশে দাঁড়ায় না সরকার বা পরিবহন কর্তৃপক্ষের কেউ-ই।

চালকের অসতর্কতাজনিত কারণে ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বলে এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। অন্য কারণগুলো হলো সড়ক ও সেতুর ত্রুটি, যানবাহনের পরিমাণ বৃদ্ধি, গাড়ির দ্রুত গতি, সড়কের ওপর গড়ে ওঠা হাটবাজার, দক্ষ চালকের অভাব, মেয়াদোত্তীর্ণ ত্রুটিপূর্ণ গাড়ির অবাধ চলাচল, অতিরিক্ত মালামাল ও যাত্রী পরিবহন, সড়কের স্থানে স্থানে মার্কিং না থাকা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা।

অন্যদিকে রেলক্রসিংয়ে বার বার দুর্ঘটনা ঘটলেও এর কোনো প্রতিকার করা হচ্ছে না। সরকারী হিসবে সারা দেশে রেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা দুই হাজার ৪৯৫। এর মধ্যে এক হাজার ৪১২টিরই কোন অনুমোদন নেই। অনুমোদিত ক্রসিংয়ের মধ্যে ৩৭০টিতে গেটম্যান এবং বেরিয়ার আছে। এর মধ্যে এক হাজার ৪২টি ক্রসিং দিয়ে গেটম্যান ও বেরিয়ার ছাড়াই ট্রেন চলাচল করছে। রাজধানীর মধ্যেই ৩০টি লেবেল ক্রসিং রয়েছে সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, গেটম্যান ও বেরিয়ার না থাকায়ই রেল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

সড়ক দুর্ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী ব্যক্তির উল্লেখযোগ্য কোনো সাজা হয়নি। ঘটনাস্থলে গাড়ি, চালক ও হেলপার আটক হলেও আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে হয় তারা বেরিয়ে যায়, নয়তো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মালিক-পুলিশ গোপন আঁতাতে বিষয়টির সুরাহা হয়ে যায়।

সড়ক দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু হলে মামলা দায়ের করা হয় বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারায়। এটি জামিনযোগ্য অপরাধ। এতে আসামীকে আটকে রাখা যায় না। দায়ের করা মামলায় বাদী হয়ে থাকে পুলিশ।

সড়ক দুর্ঘটনার শতকরা ৯০ ভাগ মামলাই দেখানো হয় অপমৃত্যু মামলা হিসেবে। মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হয় না। এছাড়া পুলিশের দুর্বল প্রতিবেদনের কারণেও আসামী গাড়িচালকরা আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।

সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ গেলে, আর কত দীর্ঘ হলে থামবে এই মৃত্যুর মিছিল? আমরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির অবসান চাই, চাই সবার জন্য নিরাপদ সড়ক।

সড়ক দুর্ঘটনা নামের এই হত্যাযজ্ঞে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর দায় পরিবহন মালিক, চালক, তদারককারী কর্তৃপক্ষ ও সরকার কেউ-ই এড়াতে পারে না। ফলে তাদের প্রত্যেকেরই এ বিষয়ে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

ব্রেকিংনিউজ/এফই



আপনার মন্তব্য

সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত ৩২


উপরে

ব্রেকিং